শিং মাছের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন
তিতাসপাড়ের কন্যার অনন্য অর্জন
গবেষণাগারে ড. তাসলিমা খানম
ইমতিয়াজ আহমেদ
প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৪ | ০৬:২৯ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৪ | ১৬:১৩
স্বাদুপানির উৎপাদিত মাছের আড়াই শতাংশের বেশি আসে শিং ও মাগুর মাছ থেকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, অতিরিক্ত আহরণ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে দেশীয় এ মাছ বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। তবে আশার কথা, দেশীয় শিং মাছের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচনে সফল হয়েছেন তিতাসপাড়ের কন্যা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) অধ্যাপক ড. তাসলিমা খানম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার সাতমোড়া গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তাসলিমার। চার ভাইবোনের সংসারে কেটেছে তাঁর শৈশবের দুরন্তপনার দিনগুলো। তবে বাবার চাকরির সুবাদে তাসলিমা খানমের শৈশব-কৈশোরের পুরো সময় কেটেছে সিলেটে। ছুটিতে বাড়ি এলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে নেমে সোজা লঞ্চে করে নবীনগর আসতে হতো নদীপথ ধরে। এখন মাত্র ২০ মিনিটে স্পিডবোটে তিতাস নদী পার হওয়া যায়। তিতাসপাড়ের জীবন, জেলেপাড়া, মাঝি-মল্লাদের নৌকায় মাছ ধরে জীবিকা ধারণ– এসবই তাসলিমার বুকের মধ্যে বাস করে। সেই তিতাসপাড়ের কন্যাই বিশ্বকে ধারণ করে আছেন। যে কারণে মাছ নিয়ে গবেষণাকে তিনি করেছেন জীবনের ব্রত। এই বিজ্ঞানী দেশীয় শিং মাছের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
শিং মাছ বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রজাতি। উন্নত মানের আমিষ, ক্যালসিয়াম ও আয়রনসমৃদ্ধ এবং কম কাঁটা ও স্বল্প চর্বিযুক্ত মাছটি পুষ্টি ও ঔষধি গুণাগুণের জন্য সুপরিচিত। এ কারণে প্রাচীনকাল থেকে এটি রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২০২০-২১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী স্বাদুপানির মোট উৎপাদিত মাছের ২ দশমিক ৫২ শতাংশ আসে শিং ও মাগুর মাছ থেকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, অতিরিক্ত আহরণ ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে দেশীয় এসব মাছ বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন।
কিছু কিছু মাছের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদে অর্থাৎ স্ত্রী ও পুরুষ মাছের দৈহিক বৃদ্ধির পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে শিং মাছ অন্যতম। যেখানে স্ত্রী শিং মাছের বৃদ্ধি পুরুষ মাছ অপেক্ষা ৪০-৬০ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। এই মাছের বাণিজ্যিক উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তেলাপিয়ার মতো মনোসেক্স শিং মাছ উৎপাদনকে অন্যতম উপায় হিসেবে মনে করা হয়। সফলভাবে মনোসেক্স শিং মাছ উৎপাদনের জন্য পুরুষ-স্ত্রী মাছ নির্ধারণকারী জিন শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি। সর্বাধুনিক নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করার মাধ্যমে দ্রুত পুরুষ-স্ত্রী মাছ নির্ধারণকারী জিন শনাক্তকরণ সম্ভব।
সেই লক্ষ্যে দেশীয় শিং মাছের প্রথম জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি ও জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসলিমা খানমের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, জাপান ও সুইডেনের একদল গবেষক। নিজস্ব অর্থায়নে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে ২০২০-এ করোনাকালে শুরু হয় প্রকল্পটি। পরবর্তী সময়ে ২০২২-২৪ সাল পর্যন্ত জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্সের (জেএসপিএস) অর্থায়নে শিং মাছের জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের কাজটি সম্পন্ন হয়। ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে সংগৃহীত দেশীয় শিং মাছের নমুনা সম্প্রতি উদ্ভাবিত সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে বায়োইনফরম্যাটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে দেশীয় শিং মাছের প্রথম ড্রাফট জিনোম তৈরি করা হয়।
পুরুষ-স্ত্রী মাছ নির্ধারণকারী জিন শনাক্তকরণের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সংগ্রহ করে বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে মোট ৪০টি ফ্যামিলি তৈরি করা হয়। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে মাছ সংগ্রহ ও ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে শিং মাছের সফলভাবে পোনা উৎপাদনের কাজে এ প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ফিশারিজ বায়োলজি ও জেনেটিক্স বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। করোনা মহামারি ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে শেষ পর্যন্ত আটটি ফ্যামিলি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় এবং পোনার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এই আটটি ফ্যামিলির প্রায় ৮০০টি পোনার নমুনা জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সিকোয়েন্সিং ও জিন শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহার করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তৈরীকৃত ড্রাফট জিনোম ব্যবহার করে সম্ভাব্য পুরুষ-স্ত্রী মাছ নির্ধারণকারী বা সেক্স-ডিটারমাইনিং (এসডি) জিন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা কোনো দেশীয় মাছের ক্ষেত্রে প্রথম। শিং মাছের গবেষণা প্রকল্পটির ফলাফল ২০২৪ সালের মার্চে জাপানিজ সোসাইটি অব ফিশারিজ সায়েন্স আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়।
তাসলিমা খানম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করার পরের বছরই আমি কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে বিশ্বের মাৎস্যবিজ্ঞানে খ্যাত যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব অ্যাকুয়াকালচারে তেলাপিয়া মাছের জেনেটিক্স, জিনমিক্স ও সেক্স ডিটারমিনেশন নিয়ে গবেষণা শুরু করি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ৮টি গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল আমি বাংলাদেশের মাছ নিয়ে মৌলিক ও ফলিত গবেষণা শুরু করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে আমি দুই বছরের জন্য জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্স (জেএসপিএস) ফেলোশিপ পাই এবং সেখানকার অধ্যাপকের সম্মতিতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল শিং মাছের জিনোম সিকোয়েন্স ও জিন শনাক্তকরণের কাজটি জেএসপিএসের অর্থায়নে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করি। এই কাজটির পাশাপাশি আমি স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত শিং ও তেলাপিয়া মাছ থেকে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালে দুটি মাছের প্রবায়োটিক উদ্ভাবন করি, যা বিভিন্ন আধুনিক ও প্রচলিত চাষ পদ্ধতিতে আশানুরূপ ফল পাওয়া গেছে।’