ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

নারী নির্যাতন ছয় মাসের পরিসংখ্যান

নারী নির্যাতন ছয় মাসের পরিসংখ্যান
×

পুরুষতান্ত্রিকতা ছাড়াও বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা নারী নির্যাতন না কমার অন্যতম কারণ শিল্পকর্ম :: সুজাতা সেটিয়া

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা কিংবা সোনারগাঁয়ে নিজ ঘরে ঢুকে এক গৃহিণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ– এগুলো কেবল সংবাদপত্রের বিচ্ছিন্ন কোনো শিরোনাম নয়। এসব আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত এক ভয়ংকর ব্যাধির উপসর্গ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, আইনি কাঠামোর প্রয়োগগত সীমাবদ্ধতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত দেশের নারীদের জন্য একটি মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে চলেছে। নারী নির্যাতন আজ কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই, এটি নারীর স্বাধীন অস্তিত্বকে পদ্ধতিগতভাবে ক্ষুণ্ন করার এক বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত

পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকানো আর্তনাদ
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা ও অপরাধের ধরনে যে পরিবর্তন এসেছে, তা ভীষণ উদ্বেগজনক। আইন ও নীতির উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন নারীরা প্রতিনিয়ত এই সহিংসতার আতঙ্কে জীবনযাপন করছেন, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই একটি সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) সারাদেশে ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা কিছুটা কম মনে হলেও, অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর ভেতরের চিত্রটি শিউরে ওঠার মতো।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো ‘ধর্ষণের পর হত্যা’র অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের পর হত্যার হার ছিল প্রায় ৪.৯৮ শতাংশ (২২ জন)। অথচ ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯.৪০ শতাংশে (৩০ জন)। অর্থাৎ অপরাধীদের মধ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা ভয়ংকরভাবে বেড়েছে। আইনের কঠোরতা তাদের নিবৃত্ত করার বদলে ভুক্তভোগীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার মতো পরিকল্পিত হত্যার দিকে প্ররোচিত করছে। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত অবস্থায় আছে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীরা (৭৩ জন)। এমনকি ৭-১২ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও ধর্ষণের হার (৬৮ জন) অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

পরিবার, যা একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেটিই কাঠামোগত পুরুষতন্ত্রের কারণে অনেক নারীর জন্য হয়ে ওঠে নির্মম মৃত্যুফাঁদ। পরিসংখ্যান মতে, পারিবারিক পরিমণ্ডলে নারীর সবচেয়ে বড় ঘাতক হলো তাঁর নিজের স্বামী, যাকে সমাজ তাঁর রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৯১ জন নারী তাদের স্বামীর হাতে এবং ২১ জন নারী স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে খুন হয়েছেন। যৌতুক, পরকীয়া বা অতি সাধারণ সাংসারিক মতবিরোধের জেরে এ ধরনের খুনগুলো অনায়াসে সংঘটিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এই ছয় মাসে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ৬৭ জন নারী। সমাজতাত্ত্বিক বিবেচনায় এগুলো নিছক কোনো ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি বা ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’।

সংঘবদ্ধ নারীবিদ্বেষ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি
নারী নির্যাতন আজ আর কেবল কোনো একক ব্যক্তির অপরাধ নয়, এটি একটি সংঘবদ্ধ সামাজিক সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, নারীদের হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ছয়জন পুরুষ নিহত এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবাদকারীদের প্রকাশ্যে খুন বা জখম করার মাধ্যমে সমাজে যে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়, তা পরোক্ষভাবে অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার অভাবও প্রকট। সামাজিক কলঙ্কের ভয়, প্রভাবশালীদের হুমকি এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইয়ের ব্যয়ভার ভুক্তভোগীদের মামলা করা থেকে বিরত রাখে। সোনারগাঁয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এক গৃহবধূর ঘটনাটি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজেদের ভাড়া বাসায় ফিরতে না পেরে হাসপাতালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্র এবং সমাজের কাঠামোগত ব্যর্থতা এখানে প্রকট, যেখানে নির্যাতনের শিকার নারী ও তাঁর পরিবারের সুরক্ষার চেয়ে অপরাধীর সামাজিক অবস্থান বেশি গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, ঢাকার নবাবগঞ্জে চুরির অপবাদ দিয়ে দুই তরুণীকে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন ও জনসমক্ষে চুল কেটে দেওয়ার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সমাজ সমষ্টিগতভাবে কতটা নারীবিদ্বেষী হতে পারে। জনসমক্ষে চুল কেটে দেওয়া নিছক কোনো নির্যাতন নয়, এটি নারীর আত্মপরিচয় ও মর্যাদাকে আঘাত করার এক মধ্যযুগীয় লিঙ্গভিত্তিক শাস্তি। 

প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা একটি জটিল কাঠামোগত ব্যাধি। এই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পেছনে বেশ কিছু আন্তঃসম্পর্কিত কারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ক্রিয়াশীল রয়েছে।
নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাবক এবং অপরাধীদের প্রধান হাতিয়ার হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আইনি কাঠামো, যেমন ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’ অত্যন্ত কঠোর এবং এতে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির বিধান থাকলেও, এর বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। ব্র্যাক এবং সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী একটি বিশদ গবেষণা থেকে জানা যায়, এ ধরনের মামলায় অপরাধীর চূড়ান্ত সাজা পাওয়ার হার মাত্র তিন শতাংশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ আসামি প্রমাণের অভাবে বা আপসের কারণে খালাস পেয়ে যায়। অপরাধীরা প্রায়ই স্থানীয় রাজনৈতিক দল বা শক্তিশালী পেশিশক্তির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে। এ রাজনৈতিক পরিচয় তাদের পুলিশ প্রশাসন ও বিচার প্রক্রিয়ায় অবাধ প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা দেয়।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় সংঘটিত একটি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা বিচারহীনতার আরেকটি বড় উদাহরণ হিসেবে আনা যেতে পারে। সেখানে এক গৃহিণী নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর পুলিশ চিকিৎসা বা মেডিকেল পরীক্ষার ব্যবস্থা না করে উল্টো মামলা নিতে দেরি করে। পুলিশের এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ এবং তদন্তে অনীহার কারণে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায় এবং অপরাধীরা সহজেই আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে।

নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই মামলা চালিয়ে যেতে বা বিচার চাইতে পারেন না। কারণ সমাজ বা রাষ্ট্রে তাদের যাওয়ার কোনো নিরাপদ জায়গা থাকে না। বাংলাদেশে নারীদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের তীব্র সংকট রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র ১৩টি। এর ফলে আর্থিক অনটন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে নারীরা নির্যাতনকারীর সঙ্গেই পুনরায় বসবাস করতে বাধ্য হন। সোনারগাঁয়ের ঘটনায় গৃহবধূর পরিবারকে নিরাপত্তার অভাবে হাসপাতালে আশ্রয় নিয়ে থাকতে হয়েছিল। কারণ রাষ্ট্র তাদের নিজ বাসভূমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো মাত্র পাঁচ দিনের জন্য সহায়তা দেয়, যা একটি দীর্ঘস্থায়ী আইনি লড়াই বা পুনর্বাসনের জন্য কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে নারী নির্যাতনের পরিসংখ্যান আমাদের অকাট্যভাবে দেখিয়ে দেয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এই অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। একটি মানবিক, বৈষম্যহীন এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন করতে হলে নারী নির্যাতনকে ব্যক্তিগত বা নারী অধিকার কর্মীদের বিষয় হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। এটিকে জাতীয় সংকট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সামাজিক আন্দোলন আকারে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তবেই হয়তো আগামী দিনে পরিসংখ্যানের পাতায় নারী নির্যাতনের এ নির্মম সংখ্যাগুলো শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। 

আরও পড়ুন

×