ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

শিশুর বিকাশে বাবার ভূমিকা

শিশুর বিকাশে বাবার ভূমিকা
×

বাবার আচরণ শিশুর মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে ছবি: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান

 সোয়ালিহীন ফাতিমা

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সদ্য বাবা হওয়া এক বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। তাঁর চোখেমুখে অদ্ভুত এক মায়া, নবজাতক কন্যাকে ঘিরে উচ্ছ্বাসের যেন শেষ নেই। সে কেবল খেলনা, খাবার বা দামি পোশাকের জোগান দিয়েই নিজের দায়িত্ব সারছে না, বরং সন্তানের রোজকার যত্নেও সমানভাবে সময় দিচ্ছে। দৃশ্যটি চমৎকার, কিন্তু একই সঙ্গে তা আমাকে এক গভীর ভাবনায় ফেলে দিল। আমাদের সমাজে সন্তান পালনের জন্য মা-বাবার যে মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা কি সত্যিই আমাদের আছে? একটি ক্ষুদ্র অংশ বাদ দিলে, শিশুর বিজ্ঞানভিত্তিক বিকাশ সম্পর্কে জানার সুযোগ বা তাগিদ–দুটোই আমাদের সমাজে এখনও বেশ সীমিত।
শিশুর জীবনের প্রথম আট বছরকে তার বিকাশের ‘প্রারম্ভিক সময়’ (আরলি চাইল্ডহুড) বলা হয়। এই সময়ের যত্ন, পুষ্টি ও উদ্দীপনা তার ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য, শিখনক্ষমতা, সুখ এবং সম্পর্কের গতিপথ চিরতরে নির্ধারণ করে দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জন্মের প্রথম ১০০০ দিনের মধ্যেই একটি শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ গঠন সম্পন্ন হয়ে যায়। ইউনিসেফের তথ্যমতে, এ সময়ে শিশুর মস্তিষ্কে জাদুকরী গতিতে নিউরনের সংযোগ ঘটতে থাকে; যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক হাজার! 
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু প্রারম্ভিক দিনগুলোয় বাবার বা পিতৃস্থানীয় কারও নিবিড় যত্ন ও সান্নিধ্য পায়, পরবর্তী জীবনে তাদের সাফল্যের হার বহুগুণ বেশি। মা ও বাবা দুজনের সঙ্গেই যখন একটি শিশুর আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তখন তার মধ্যে এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। এর ফলে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তারা যেমন এগিয়ে থাকে, তেমনি সামাজিক ও যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোতেও তারা অধিক সক্ষমতা অর্জন করে। বয়ঃসন্ধিকালে আচরণগত সমস্যা বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা তাদের মধ্যে অনেক কম থাকে। বাবার নিবিড় সাহচর্য পাওয়া শিশুরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পারিবারিক জীবনেও অনেক বেশি সুস্থ ও উন্নত সম্পর্ক তৈরিতে সক্ষম হয়।
অনেক বাবাই হয়তো আক্ষেপ করে ভাবেন, ‘আমাকে তো জীবন-জীবিকার তাগিদে সারাদিন বাইরে থাকতে হয়, সন্তানকে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় কোথায়?’ এ ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানীরা একটি দারুণ সমাধান দেন–কতটা সময় সন্তানের সঙ্গে থাকলেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সময়টা আপনি কীভাবে ব্যবহার করলেন।
বাবার সম্পৃক্ততা বলতে কেবল খেলনা কিনে দেওয়া বোঝায় না। মানসিক ও শারীরিকভাবে শিশুর কাছাকাছি থাকা, তার যত্ন নেওয়া এবং লালনপালন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সরাসরি অংশ নেওয়াকে বোঝায়। শিশুর যত্নের প্রতিটি কাজই হতে পারে তার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির দারুণ এক সুযোগ। শিশুকে খাওয়ানোর সময় বা পোশাক পালটে দেওয়ার সময় তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, তার আধো আধো শব্দকে অনুকরণ করা–এসবই শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে জাদুকরী ভূমিকা রাখে। খুব সহজ কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো শিশুর সঙ্গে খেলা করা। দিনে মাত্র ১৫ মিনিটের স্ক্রিন-মুক্ত, নিবিড় খেলাধুলা শিশুর মস্তিষ্কে হাজার হাজার নতুন নিউরনের সংযোগ ঘটাতে পারে। এই আপাত সহজ কাজগুলোর বাস্তবায়ন কিন্তু আমাদের সমাজে খুব একটা সহজ নয়। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা কিছু বদ্ধমূল ধারণা। অনেকে এখনও মনে করে, সন্তানের যত্ন নেওয়া একান্তই মায়ের দায়িত্ব। আবার যেসব বাবা লালনপালনে অংশ নেন, তাদের অনেকেই নিজেদের কেবল ‘মায়ের সহযোগী’ বা ‘হেল্পিং হ্যান্ড’ হিসেবে দেখেন। সন্তান পালনে স্ত্রীকে ‘সাহায্য’ করা নয়, বরং বাবার পূর্ণাঙ্গ ও সমান অংশীদারের ভূমিকায় নিজেকে দেখতে চাওয়াটা আজ খুবই জরুরি। সন্তানকে সফল ও সুন্দর জীবনের সুযোগ করে দিতে চাইলে প্রথাগত সামাজিক লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার পরিবর্তন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাষ্ট্রের সহায়ক নীতিকাঠামো। পিতৃত্বকালীন ছুটি, মা-বাবার জন্য প্যারেন্টিং প্রশিক্ষণ এবং শিশু বিকাশকেন্দ্রের মতো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর যত্নে অনেক করণীয় যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু বিষয় এড়িয়ে চলাও জরুরি। শিশুর একটানা কান্না বিরক্তিকর লাগতেই পারে। তখন তাকে খাবার দিয়ে, পরিষ্কার করে বা কোলে নিয়ে শান্ত করা যায়, প্রয়োজনে অন্যের সাহায্যও নেওয়া যায়। কোনোভাবেই হতাশা থেকে শিশুকে ধরে ঝাঁকানো (শেকেন বেবি সিনড্রোম) বা তার ওপর চিৎকার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, সন্তানের সামনে তার মায়ের সঙ্গে বাবা কেমন আচরণ করছেন, কীভাবে কথা বলছেন–তা শিশুর মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। করোনাকালে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ার পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, মানসিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা। 
এখন সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে–জীবনের নানা টানাপোড়েন ও চাপের কাছে আমরা হেরে গিয়ে বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করব, নাকি সন্তানের সঙ্গে একটি ইতিবাচক, সুস্থ ও সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাব? পিতৃত্ব কেবল একটি পরিচয় নয়, এটি এক আজীবন সাধনার নাম। 
r শিশুরাই সব ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
[সম্পাদিত]

আরও পড়ুন

×