ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

সমসাময়িক

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক জাগরণ

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সামাজিক জাগরণ
×

ডা. ফওজিয়া মোসলেম সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যাসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে; যা একটি সুস্থ ও সভ্য সমাজের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। কঠোর আইনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিকরা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সমাজে জেঁকে বসা নারীবিদ্বেষী মনোভাব, ক্ষমতার ভয়ানক অপব্যবহার এবং সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে দায়ী করছেন। গ্রন্থনা: দ্রোহী তারা

আমাদের সমাজে সামগ্রিকভাবে সামাজিক মূল্যবোধের এক ভয়াবহ অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। এ অবক্ষয়ের কারণে প্রতিনিয়ত সব ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। সমাজে যখন অপরাধের মাত্রা বাড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তার প্রথম শিকার হয়। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা এ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান অংশ। ফলে নারীরা ক্রমাগত সহিংসতার শিকার হচ্ছেন এবং এই সহিংসতার অন্যতম ভয়ানক ও অগ্রহণযোগ্য রূপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা।

আমাদের বুঝতে হবে, এই অপরাধগুলোর পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা অনুষঙ্গ এর সঙ্গে জড়িত। অনেক সময় পারিবারিক শত্রুতার জেরে পরিবারে নারীকে নির্যাতন করা হয়। আবার কোথাও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটলে বিপক্ষ গোষ্ঠীর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে নারীকে ধর্ষণ করা হয়।

এর সঙ্গে সাম্প্রতিককালে যুক্ত হয়েছে নারীকে ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখার এক রাজনৈতিক ও সামাজিক অপচেষ্টা। প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে নারীর মনে ভয়ের সঞ্চার করা হচ্ছে, যাতে তারা কর্মসংস্থান ও বাইরের জগৎ ছেড়ে অন্দরমহলে চলে যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই ক্ষতিকর সামাজিক ক্ষেত্র তৈরিতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।

আমাদের দেশে অপরাধের বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে তো প্রশ্ন আছেই। তবে শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। আমাদের পুরো বিচারব্যবস্থাটাই নানা অসংগতিতে ভরা এবং অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রথমত, অপরাধ প্রমাণ করার জন্য যে তদন্ত প্রক্রিয়া, তা অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। যদিও সাম্প্রতিককালে কিছু ঘটনার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে, কিন্তু সার্বিক চিত্র এখনও আশাব্যঞ্জক নয়।
বিচারব্যবস্থা উন্নত করার অর্থ শুধু বিচারক নিয়োগ, ট্রাইব্যুনাল, আদালতের সংখ্যা বাড়ানো নয়। এর সঙ্গে জড়িত অন্য অংশীজনদেরও সমভাবে উন্নত ও দক্ষ করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে, ধর্ষণ একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ এবং এর নির্ধারিত শাস্তি অপরাধীকে পেতেই হবে।

আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। তাই আপিল ও বিচার নিষ্পত্তির সময়সীমা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে ফরেনসিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট খাত আধুনিকায়ন ও ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।

যিনি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, তিনি বা তাঁর পরিবার যেন সমাজে আইনি ও সামাজিক লড়াইয়ের সাহস পান, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ভুক্তভোগী নারী যেন পরিত্যক্ত না হন, এর নিশ্চয়তা রাষ্ট্র ও সমাজকে দিতে হবে। তাঁর শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও সসম্মানে পরিবারে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁকে ‘অপাংক্তেয়’ দৃষ্টিতে দেখার মানসিকতা সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে হবে।
এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। আমরা বরাবরই বলে আসছি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, নাগরিক সমাজ এবং নারী আন্দোলনের সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হোক। এই যৌথ উদ্যোগ ও অ্যাকশন প্ল্যান সমাজের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে।

এ ছাড়া নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার বিষয়টির দিকে বিশেষভাবে জোর দিতে হবে। কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে সামাজিক, আইনগত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ‘সমতা’র বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দেওয়া অপরিহার্য। 
গবেষণায় দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক অপরাধ ও ধর্ষণের সঙ্গে কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে এই কিশোরদের ব্যবহার করে ‘কিশোর গ্যাং’ তৈরি করছে। শৈশব থেকেই তারা অপরাধ জগতে পা রাখছে; যা একটি উদ্বেগজনক বিষয়। এই কিশোরদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের জন্য পরিবার ও সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে।

এই অপরাধপ্রবণতা রুখতে গণমাধ্যমের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজকে এ আলোচনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। মূলধারার গণমাধ্যমে ছাত্র ও যুবসমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে বেশি বেশি টকশো ও সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করা উচিত; যা এখন দেখাই যায় না। যুবসমাজের কণ্ঠই পারে এ অন্ধকার দূর করতে।
পাশাপাশি বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম একটি বড় জায়গা দখল করে আছে। সেখানে নারীকে কেন্দ্র করে কোনো সমালোচনা করতে গিয়ে যে ধরনের অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়, তার ওপর একটি সুনির্দিষ্ট নজরদারি থাকা দরকার। শুধু ‘ফেসবুকের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই’ বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। নাগরিক হিসেবে আমাদেরও উচিত এ ধরনের কুৎসিত ভাষা ও পেজগুলোকে সম্মিলিতভাবে বয়কট করা।

ধর্ষণ ঠেকাতে নতুন কোনো আইনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগ। রাষ্ট্রকে এই বড় উদ্যোগটি নিতেই হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ–সবাই মিলে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। 

আরও পড়ুন

×