অযত্নের কুঁড়িরা যেখানে ফুল হয়ে ফোটে
একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে একইসঙ্গে একটি পরিবার, একটি আলোকিত সমাজ গঠনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা। ‘গুলবাগিচা’ তেমনই এক উদ্যোগ
মারিয়াম নুরসাত
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে নিত্য বসবাস এ গ্রামের মানুষদের। অভাবের তাড়নায় যেখানে দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটানোই দায়, সেখানে শিশুদের পড়ালেখা তো একরকম বিলাসিতা! এই অভাবী জনপদেরই পাঁচ বছর বয়সী ছোট্ট শিশু মাইমুনার চোখেমুখে এখন রাজ্যের উচ্ছ্বাস। প্রতিদিন সকালে সে বইখাতা বুকে চেপে ছুটে যায় এক স্বপ্নের ঠিকানায়। সেখানে শুধু বর্ণমালা শেখানো হয় না, পরম মমতায় তার হাতে তুলে দেওয়া হয় পুষ্টিকর খাবার। মাইমুনার এই স্বপ্নের বাগানের নাম ‘গুলবাগিচা’।
উচ্ছ্বসিত মাইমুনার ভাষায়, ‘ম্যাডাম আমাদের খুব আদর করে পড়ায়। প্রতিদিন ডিম, দুধ, কলা খেতে দেয়। আমার স্কুলে যেতে খুব ভালো লাগে।’
মাইমুনার মতো হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জীবনে এমন আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট-সিজেডএমের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র ‘গুলবাগিচা’।
একটি বাগান বা বাগিচায় যেমন সঠিক আলো, বাতাস ও পরিচর্যা পেলে একটি মৃতপ্রায় গাছও সতেজ হয়ে ফুল ফোটায়, ঠিক তেমনি সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের জীবনে শিক্ষা, পুষ্টি ও স্নেহের পরশ বুলিয়ে তাদের প্রস্ফুটিত করার লক্ষ্যেই প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘গুলবাগিচা’।
গুলবাগিচার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সমন্বিত উন্নয়ন ভাবনা। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্কুলে পাঠাতে অভিভাবকদের যেন কোনো বেগ পেতে না হয়, সেজন্য এখানে শিক্ষা উপকরণ, পোশাক, প্রতিদিনের পুষ্টিকর খাবার এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। ফলে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে সবল হয়ে ওঠে, তেমনি তাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও থাকে শতভাগ। পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখানোর ওপরও এখানে বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য দুই বছর মেয়াদি এই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ও পুষ্টি কার্যক্রমটি ইতোমধ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিগত প্রায় ১৮ বছরের যাত্রায় গুলবাগিচা কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের প্রায় ৪৫ হাজার সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষা ও পুষ্টিসেবা পেয়েছে। বর্তমানে সিজেডএমের প্রকল্প পর্যায়ে ৪০টি প্রাক-প্রাথমিক সেন্টারের মাধ্যমে এক হাজার ১৭৫ জন শিক্ষার্থীকে এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রাক-প্রাথমিক শেষে এসব শিশু যেন ঝরে না পড়ে, সেজন্য সিজেডএম সরাসরি আটটি প্রাথমিক স্কুল, চারটি মাধ্যমিক স্কুল এবং তিনটি মাদ্রাসা পরিচালনা করছে, যেখানে বর্তমানে দুই হাজার ৩২৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে এতিম ও মেয়েশিশুদের জন্য আবাসিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে, যা মেয়েদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে অভাবনীয় ভূমিকা রাখছে।
গুলবাগিচা শুধু শিশুদের জীবন গড়ছে না, পাশাপাশি প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়নেও রাখছে অনবদ্য ভূমিকা। এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় স্থানীয় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষিত নারীদের। সিজেডএমের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর এলাকার গুলবাগিচা কেন্দ্রের শিক্ষিকা আলমিনা বলেন, ‘শিশুরা এখানে নিজ থেকেই আসার জন্য উৎসাহী থাকে। খেলার ছলে তাদের পড়ানো হয়। এই কাজটি করে আমি যেমন আত্মনির্ভরশীল হয়েছি, তেমনি সমাজের জন্য কিছু করতে পারার আত্মতৃপ্তিও পাচ্ছি।’
দুই বছরের নিবিড় পরিচর্যা শেষে গুলবাগিচার এই শিশুদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সিজেডএমের গুলবাগিচা কর্মসূচির প্রধান লে. কর্নেল (অব.) জমির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য শিশুদের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। এই উদ্যোগের ফলে এমন অনেক শিশু আজ শিক্ষার আলো পাচ্ছে, যারা হয়তো অন্যথায় সারাজীবনের জন্যই অন্ধকারে থেকে যেত।’
- বিষয় :
- শিশু