ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

অযৌক্তিক প্রশ্ন, বাধা

রাজনীতিতে নারী

রাজনীতিতে নারী
×

নারীর নিরাপদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত / অলংকরণ :: অরবিন্দ হালদার

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রায়ই শীর্ষ পদের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা হয়। অথচ একজন নারী কতটা নিরাপদে, লিঙ্গবিদ্বেষী আক্রমণের শিকার না হয়ে রাজনীতি করতে পারছেন–সেটিই প্রকৃত গণতন্ত্রের মাপকাঠি। সংবিধানে সমান অধিকার থাকলেও বাস্তব রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীরা এক গভীর ‘রাজনৈতিক নাগরিকত্বের ব্যবধান’-এর শিকার। রাজনৈতিক মতাদর্শের বদলে যখন নারীর শরীর, চরিত্র ও ব্যক্তিগত জীবন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তি নারীকে কোণঠাসা করে না; বরং তা হয়ে ওঠে পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারই এক গুরুতর সংকট। লিখেছেন রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
--------------------------------------------------------

গণতন্ত্রকে বিচার করার একটি সহজ কিন্তু অস্বস্তিকর উপায় আছে। প্রশ্নটি হলো– একজন নারী কতটা নিরাপদে রাজনীতি করতে পারেন? গণতন্ত্র নিজে লিঙ্গধারী নয় কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার অনুশীলন প্রায়ই লিঙ্গভিত্তিক হয়ে ওঠে। ফলে আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক সমতা বাস্তব জীবনে অসম রাজনৈতিক নাগরিকত্বে রূপ নেয়।

তিনি কি নিজের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ করতে পারেন, নাকি তাঁর শরীর, চরিত্র এবং ব্যক্তিগত জীবনই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বিতর্কের প্রধান বিষয়? যদি দ্বিতীয়টিই সত্য হয়, তাহলে সংকটটি কেবল নারীর নয়; সংকটটি গণতন্ত্রের। কারণ একটি গণতন্ত্রের গুণগত মান শুধু নির্বাচন, সংবিধান বা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং কে নিরাপদে নেতৃত্ব দিতে পারে, কার কণ্ঠস্বরকে বৈধ বলে গ্রহণ করা হয় এবং কে সমান মর্যাদায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে–সেই বাস্তবতা দিয়েও তা বিচার করতে হয়।

বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের আলোচনায় একটি মৌলিক ভুল দীর্ঘদিন ধরে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। আমরা জানতে চেয়েছি–রাজনীতিতে কতজন নারী আছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–রাজনীতি কতজন নারীর জন্য নিরাপদ? এ দুই প্রশ্নের পার্থক্যই পুরো আলোচনার ভিত্তি বদলে দেয়। কারণ সংখ্যাগত উপস্থিতি কখনোই রাজনৈতিক সমতার সমার্থক নয়। একজন নারী নির্বাচিত হতে পারেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত থাকতে পারেন; জনপরিসরে দৃশ্যমান হতে পারেন, কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব নাও দেওয়া হতে পারে। আইনের চোখে তিনি সমান নাগরিক হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাঁকে সমান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে গ্রহণ নাও করতে পারে।

বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়–দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী ছিলেন, বিরোধীদলীয় নেতা নারী ছিলেন, স্পিকার নারী ছিলেন; তাহলে আবার নারীর রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রশ্ন কেন? এই যুক্তি প্রথম দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের বিচারে এটি অসম্পূর্ণ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কয়েকটি পদে নারীর উপস্থিতি পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন নয়; ব্যতিক্রম কখনোই কাঠামোর প্রমাণ হতে পারে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো–একজন সাধারণ নারী কি দলীয় রাজনীতিতে পুরুষের সমান সুযোগ নিয়ে প্রবেশ করতে পারেন?

রাজনৈতিক নাগরিকত্বের ব্যবধান
এই বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আমি ‘রাজনৈতিক নাগরিকত্বের ব্যবধান’ ধারণাটি প্রস্তাব করছি। সংবিধান নারীকে সমান রাজনৈতিক অধিকার দিয়েছে; ভোটাধিকার, নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক ভিত্তিও নিশ্চিত করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক অধিকার কেবল আইনের ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হলেই তা বাস্তবে সমানভাবে কার্যকর হয় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক নির্ধারণ করে–কে নিরাপদে রাজনীতি করতে পারবেন, কার নেতৃত্বকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা হবে এবং কাকে প্রতিনিয়ত নিজের রাজনৈতিক বৈধতা প্রমাণ করতে হবে। এখানেই আইনগত নাগরিকত্ব ও বাস্তব রাজনৈতিক নাগরিকত্বের মধ্যে একটি গভীর ব্যবধান তৈরি হয়। 

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণাও এ বিশ্লেষণকে সমর্থন করে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এবং ইউএন উইমেন-এর গবেষণায় দেখা যায়, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রধান বাধা শুধু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং দলীয় মনোনয়নে সীমিত প্রবেশ, রাজনৈতিক অর্থায়নের অসম সুযোগ, ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক থেকে বাদ পড়া, নির্বাচনী ও অনলাইন সহিংসতা এবং নারী নেতৃত্ব সম্পর্কে বিদ্যমান সামাজিক পক্ষপাত। অর্থাৎ সংকটটি কেবল প্রতিনিধিত্বের নয়; এটি ক্ষমতার কাঠামোতে সমান প্রবেশাধিকার, রাজনৈতিক বৈধতা এবং নিরাপদ অংশগ্রহণের সংকট।

এ কারণেই নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে শুধু সংসদে বা স্থানীয় সরকারে কতজন নারী আছেন– এই পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা রাজনৈতিক নাগরিকত্বের সমার্থক নয়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক অগ্রগতি তখনই ঘটে, যখন একজন নারী তাঁর লিঙ্গপরিচয়ের কারণে নয়, তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা, নেতৃত্ব ও সক্ষমতার ভিত্তিতে স্বীকৃতি পান।

শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়
রাজনৈতিক নাগরিকত্বের ব্যবধানের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে নারীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতায়। খুব দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্ক সরে যায় নারীর বক্তব্য, নীতি বা অবস্থান থেকে শরীর, পোশাক, চরিত্র, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা যৌনায়িত ইঙ্গিতের দিকে। যেন একজন নারী রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে তাঁর নারী পরিচয়ই জনপরিসরের প্রধান আলোচ্য বিষয়। এটি বিচ্ছিন্ন কিছু কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের সমষ্টি নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার একটি সুপরিচিত কৌশল। কারণ কোনো নারীর যুক্তিকে খণ্ডন করার চেয়ে তাঁর রাজনৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা অনেক বেশি কার্যকর। এ কারণেই নারীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল শারীরিক নয়; এটি প্রতীকী, মনস্তাত্ত্বিক এবং ক্রমবর্ধমানভাবে ডিজিটাল। সামাজিক মাধ্যমে পরিকল্পিত চরিত্রহনন, যৌনায়িত ভাষা, গুজব কিংবা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার শুধু একজন নারী রাজনীতিবিদকে আঘাত করে না; ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নারী নেতৃত্বের কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠায়–রাজনীতিতে প্রবেশের মূল্য হতে পারে ব্যক্তিগত মর্যাদার অবিরাম অবমাননা।

ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু আক্রমণের শিকার ব্যক্তিরা নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণতান্ত্রিক জনপরিসর। কারণ যখন নারী রাজনীতিবিদরা নিজেদের নিরাপত্তা, মর্যাদা বা পরিবারের কথা ভেবে আত্মসংযমে বাধ্য হন, তখন জনপরিসর থেকে হারিয়ে যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কণ্ঠ। রাজনৈতিক সহিংসতা তাই কেবল ব্যক্তিকে নীরব করে না; এটি গণতন্ত্রকেও দরিদ্র করে।

প্রশ্নটি নারীর নয়, গণতন্ত্রের
বাংলাদেশে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আমাদের আলোচনাকে নতুনভাবে শুরু করার সময় এসেছে। প্রশ্নটি আর কেবল কতজন নারী রাজনীতিতে আছেন তা নয়; বরং তারা কী শর্তে রাজনীতি করছেন। তারা কি সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে নেতৃত্ব দিতে পারছেন নাকি এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখোমুখি হচ্ছেন, যেখানে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের আগেই শরীর, চরিত্র এবং ব্যক্তিগত জীবন বিচার করা হয়?

এ কারণেই নারীর রাজনৈতিক সংকটকে আমি প্রতিনিধিত্বের সংকটের চেয়ে রাজনৈতিক নাগরিকত্বের সংকট হিসেবেই দেখতে চাই। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা কেবল ভোটের বাক্সে নয়; বরং জনপরিসরে; যেখানে নির্ধারিত হয় কার কণ্ঠস্বরকে বিশ্বাস করা হবে, কার নেতৃত্বকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা হবে এবং কে নিরাপদে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন।

তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত নারীর নয়; বাংলাদেশের গণতন্ত্রের। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একজন নারীর যুক্তির আগে তাঁর শরীর, চরিত্র কিংবা ব্যক্তিগত জীবন বিচার হয়, সেখানে গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে; নাগরিক সমতায় পৌঁছাতে পারে না। নারীর নিরাপদ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো বিশেষ সুবিধার দাবি নয়; এটি একটি পরিণত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। কারণ যে রাষ্ট্র একজন নারীকে পূর্ণ রাজনৈতিক নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কোনো নাগরিকের জন্যই সমান গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারে না। গণতন্ত্রের হয়তো কোনো লিঙ্গ নেই; কিন্তু গণতন্ত্রের অনুশীলন যদি লিঙ্গনিরপেক্ষ না হয়, তবে সমান নাগরিকত্বও কেবল সংবিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×