ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স ম সা ম য়ি ক

‘পারিবারিক সহিংসতা রোধে প্রয়োজন জবাবদিহি ও আইনের প্রয়োগ’

‘পারিবারিক সহিংসতা রোধে প্রয়োজন জবাবদিহি ও আইনের প্রয়োগ’
×

.

সালমা আলী

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৭ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:৫৪

প্রায় এক যুগ আগে সিফাত আলী ও সৈয়দা ফাহমিদা তাহসিন (কেয়া) ভালোবেসে দাম্পত্য সম্পর্কে আবদ্ধ হন। রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় থাকতেন তারা। এ দম্পতির রয়েছে চার সন্তান। গত ১৩ আগস্ট মধ্যরাতে ফাহমিদার মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, ফাহমিদাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন স্বামী সিফাত। পরে তিনি ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেন। ঘটনার সত্যতা আদালতে প্রমাণসাপেক্ষ। তবে এমন ঘটনা আমাদের সমাজে প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়েছে। 
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩২২ জনের। এর মধ্যে ২০৮ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। আত্মহত্যা করেছেন ১১৪ জন। সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে স্বামীর হাতে– ১৩৩ জন নারী।

----------------------------------------------------------------------------

আমরা আজ এমন একটি ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে প্রচলিত আইন থাকা সত্ত্বেও এর কোনো কার্যকর প্রয়োগ নেই। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ একটি প্রতিরোধমূলক আইন। সেটি এখন কার্যত শোপিসে পরিণত হয়েছে। এ আইনের আওতায় যৌন, মানসিক, শারীরিক এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের পরিভাষাগুলো স্পষ্ট করা হয়েছে। আইনের প্রাথমিক স্তরে যেটুকু কাঠামো থাকা দরকার–যেমন প্রশিক্ষিত জনবল, বাজেট, সমন্বয় এবং নজরদারি–সবকিছুরই ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পর্যাপ্ত লোকবল নেই। যেসব পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, সেখানে যোগ্য ব্যক্তির অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বাজেট বরাদ্দ অপ্রতুল।

ম্যাজিস্ট্রেটদের অভাব, নারীবিষয়ক কর্মকর্তার সহযোগিতা না থাকা এবং পুলিশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও মনোযোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, পুলিশ প্রয়োজনীয় সময়ে হস্তক্ষেপ নিতে পারছে না বা চায় না। আইনের ভয় না থাকার কারণে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবার অনেকেই জেল থেকে জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে–এটি ভয়ংকর ব্যাপার।

আমরা দেখছি, সামাজিক বিভিন্ন অস্থিরতা মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল; যার প্রতিক্রিয়ায় পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। সম্প্রতি রান্নাঘরে রান্নার প্রস্তুতির সময় স্ত্রীকে হত্যা করার মতো ঘটনা আমাদের সামনে এসেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটিও আজ নারী ও শিশুর জন্য আর নিরাপদ থাকছে না। কারণ আইনের প্রয়োগ নেই, বিচার নেই, শাস্তি নেই, জবাবদিহি নেই।

আইন প্রয়োগের মূল চালিকাশক্তি হলো রাষ্ট্রের সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা, যা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত বা কম সক্রিয়। পুলিশ বাহিনীতে পর্যাপ্ত লোকবল নেই, তাদের প্রশিক্ষণ নেই এবং মামলা পরিচালনায় সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ লোক না থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব অর্পণ করা হচ্ছে। ফলে ঘটনাগুলো সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ বা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, নতুন আইন তৈরির দিকে তারা যতটা গুরুত্ব দিয়েছে, প্রচলিত আইনের বাস্তবায়নে সেই মনোযোগ নেই। প্রশ্ন হলো–যেখানে বিদ্যমান আইনই প্রয়োগ হচ্ছে না, সেখানে নতুন আইন করে কী হবে? অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালা দিয়েই কার্যকর পরিবর্তন আনা যায়। যেমনটি আমরা পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখি; আমাদের দেশে সেটিও নেই।
সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে–যেমন সিআরসি (চাইল্ড রাইটস কনভেনশন)। বাস্তবে শিশু অধিকার বা নারী নিরাপত্তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। বিদেশে নারীরা কাজ করতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছেন। প্রতিনিয়ত নিজ ঘরে নারী মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে–এই মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি, শ্রমনীতি, অভিবাসননীতি–সব জায়গায় জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।

আজ আমাদের দরকার অভ্যন্তরীণ আইন ও নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জনবল বৃদ্ধি, বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়। এসব ছাড়া শুধু কাগুজে আইন দিয়ে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ বলয় তৈরি সম্ভব নয়।

এখন সময় এসেছে জিরো টলারেন্স নীতিকে বাস্তবসম্মতভাবে প্রয়োগ করার। শুধু বক্তৃতা দিয়ে নয়, দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে অপরাধীরা বুঝতে পারে রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে না বরং কঠোরতম শাস্তি দেবে। আমরা চাই, তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ এবং দীর্ঘ মেয়াদে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা; যার প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে। আজকের রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে আমাদের স্পষ্ট দাবি–নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করুন। এ ছাড়া গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ নিশ্চিতভাবেই 
প্রশ্নবিদ্ধ হবে। 

লেখক: সভাপতি, বিএনডব্লিউএলএ

গ্রন্থনা: দ্রোহী তারা
 

আরও পড়ুন

×