ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নিজের ব্র্যান্ড গড়ার গল্প

নিজের ব্র্যান্ড গড়ার গল্প
×

ইসরা সুলতানা তোফা

 সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৬

একসময় শুধুই নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য খুঁজছিলেন কাস্টমাইজড পণ্য। বাজার ঘুরে দেখলেন নিয়ম আলাদা–কমপক্ষে দশটি না বানালে কেউ অর্ডার নেয় না। অথচ তাঁর দরকার ছিল মাত্র একটি। সেই আক্ষেপই একসময় রূপ নেয় নতুন এক ভাবনায়। কেন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হবে না, যেখান থেকে কেউ চাইলে নিজের জন্য একটি মাত্র কাস্টমাইজড পণ্যও বানিয়ে নিতে পারবেন।
এ প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘তাহামস’। সময়টা ২০২০ সাল। শুরুতে ছয়জন তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন এক জায়গায় মিলে তৈরি হয় এই নাম, যেখানে রয়েছে প্রত্যেকের নামের আদ্যক্ষর মিলে– তোফা, আশিক, হাসিন, আদিবা, মাহাদি ও শিমুল। তারা তখন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের শিক্ষার্থী। 
তোফা জানান, ‘আমরা সবাই তখন শিক্ষার্থী। ভাবতাম, ভিন্ন কিছু করব। কাস্টমাইজড পোশাকের একটি বাজার আছে। এটি সঠিকভাবে কেউ ধরতে পারছে না। সেখানেই সুযোগ দেখেছিলাম।’
এই স্বপ্নের পথ মসৃণ ছিল না। প্রথম বড় ধাক্কা এলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। হঠাৎ করেই তাদের ফেসবুক পেজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন মনে হয়েছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। এরপর ছয় উদ্যোক্তার চারজনই সরে গেলেন। কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে গেলেন, কেউবা চাকরিতে যোগ দিলেন। একসময় দেখা গেল, বাকি আছেন কেবল তোফা আর তাঁর স্বামী আশিক আহমেদ।
তোফা বলেন, ‘তখন মনে হয়েছিল হয়তো এগোনো সম্ভব নয়। কিন্তু আমার ভাবনা ছিল– এতদূর এসে যদি থেমে যাই, তাহলে তো সব বৃথা। সে কারণে ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক লড়াই চালিয়ে যাব।’
অনলাইনে কাজ করতে গিয়ে তোফাকে বারবার পড়তে হয়েছে অর্থনৈতিক সংকটে। লোকবল কমে যাওয়ায় অনেক সময় অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি করাও সম্ভব হয়নি। তবে তিনি হেরে যাননি। প্রতিটি সংকটই তাঁকে নতুনভাবে দাঁড়াতে শিখিয়েছে।
এখন তাদের পণ্য তৈরি হয় বিভিন্ন কারখানায়। টি-শার্টের জন্য আলাদা গার্মেন্টসে হয় নিটিং, ডাইং আর সুইং। আবার জিন্স, পাঞ্জাবি কিংবা পারফিউম তৈরি হয় নিজস্ব তদারকিতে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মোহাম্মদপুরে প্রথম ডিসপ্লে সেন্টার চালু হয়। এ বছর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে দ্বিতীয় আউটলেট খোলার মধ্য দিয়ে শুরু হলো নতুন অধ্যায়।
এ প্রসঙ্গে তোফা বলেন, ‘যখন প্রথম আউটলেট খুলি, ভেতরে ভেতরে ভয় কাজ করছিল–ক্রেতা পাব তো? অনলাইনের বাইরে টিকে থাকতে পারব তো? ক্রেতার সাড়া দেখে বুঝলাম, আমরা সঠিক পথে আছি।’ তিনি আরও জানান, ঢাকার বাইরের ক্রেতাও নিয়মিত আসেন। অনেকে চট্টগ্রাম বা সিলেটে আউটলেট খোলার কথা বলেন। আবার অনেকে বলেন, উত্তরায় বা মিরপুরেও আউটলেট খোলা উচিত। এটিই এখন তাহামসের পরবর্তী পরিকল্পনা।
বর্তমানে অফিস ও আউটলেটে কাজ করছেন ২৬ জন কর্মী। তাদের মধ্যে পাঁচজন নারী। তোফার আক্ষেপ এখানেই–‘মেয়েরা মার্কেটিংয়ে খুব একটা আসে না। আমি চাই তারা আরও সাহসী হয়ে এই খাতে এগিয়ে আসুক।’
তোফার চোখে ঝিলিক দেখা যায় যখন তিনি তাঁর নিজের পণ্য নিয়ে কথা বলেন। জানান, ‘আমাদের মূল পণ্য নিট আইটেম টি-শার্ট, হুডি ও পাঞ্জাবি। পাশাপাশি আছে জিন্স, অ্যাকসেসরিজ, ওয়াটার বোতল, মগ, ফ্রেম আর পারফিউম। পারফিউমের অয়েল বাইরে থেকে আনি, কিন্তু ফর্মুলেশনটা আমরা নিজেরা করি।’
তোফার স্বপ্ন শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা প্রচুর। সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি। এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমি সবসময় বিশ্বাস করি, স্বপ্নটা নিজের হলে বাস্তবায়ন করাও নিজের দায়িত্ব। অন্যরা সহযোগিতা করবে কিনা–সেটি ভেবে সময় নষ্ট করার কিছু নেই। পথটা কঠিন হলেও যদি শেষ পর্যন্ত আলো দেখা যায়, তাহলে সে কষ্টটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে দাঁড়ায়।’ 

আরও পড়ুন

×