‘কন্যাশিশু ও নারীর সমতায় রাষ্ট্রের দৃঢ় নীতি প্রয়োজন’
ছবি :: মাহবুব সাবিদ বিন জলিল সাজু
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৩ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২১:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
এ বছরের কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য–‘আমি কন্যাশিশু-স্বপ্ন গড়ি, সাহসে লড়ি, দেশের কল্যাণে কাজ করি’। কন্যাশিশু সমাজ ও পরিবারের বোঝা নয়। সঠিকভাবে লালনপালন, মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টি নিশ্চিত করলে তারা পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু কন্যাশিশু ও নারীকে প্রতিনিয়ত নিপীড়ন, যৌন হয়রানিসহ নানা হুমকির মুখে পড়তে হয়। দেশের সমাজ বাস্তবতায় নারীর অবস্থান-মর্যাদা-স্বীকৃতি যেমন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, তেমনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও দুর্বল। কারণ এ সবই একে-অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। গ্রন্থনা রিক্তা রিচি
-------------------------------------------------------------------------------
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া
আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট
আমরা যে আন্তর্জাতিক দিবসগুলো পালন করি, সেগুলো দিয়ে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়– কিছু একটা করা দরকার, পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আমাদের সমাজ বাস্তবতায় নারীর অবস্থান-মর্যাদা-স্বীকৃতি নিয়ে যে বিষয়গুলো সামনে আসে, তা আসলে হতাশাজনক। নানা ধরনের অতৃপ্তি-অসন্তোষ আছে। কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে যে শুধু সুযোগ-সুবিধার অসম ব্যবহার হচ্ছে তা নয়, সবার ক্ষেত্রেই হচ্ছে।
৯ অক্টোবর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে একটি সম্মেলন হয়েছে ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা কোথায়?’ শিরোনামে। বড় আকারের সম্মেলন। যে কন্যাশিশুকে আপনি গড়ে তুলবেন, বড় হয়ে সমাজে যে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলো কোথায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার থাকতে হবে, সুযোগটা সমাজের পক্ষ থেকেও থাকতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, ধর্মীয় সংগঠনে নারীর অধিকার নিয়ে সম্মেলন হচ্ছে, কিন্তু সেখানে নারী নেই। আবার এমনও হয় একজন বা দুজন নারীকে উপস্থিত করা হয় শুধু দেখানোর জন্য। আমরা এর আগে খারাপ অবস্থা তো দেখেছি, এখন আমরা যেদিকে যাচ্ছি–তা নিয়েও শঙ্কা বাড়ছে।
৮ অক্টোবর ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-এর জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হলো লালবাগ কেল্লায়। সেখানে ‘একদল’ লোক অনুষ্ঠান বন্ধ করতে গেল। কারণ সেখানে নাচ-গান হবে। আয়োজকরা আশ্বস্ত করেছেন, সেখানে কোনো নাচ-গান হবে না। কেবল বাদ্য-বাজনা হবে। তখন তারা অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি না করে চলে গেছে। এই একদল কারা? রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তাদের আশ্বস্ত করতে হচ্ছে যে নাচ হবে না, তাহলে বিষয়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়! আমরা ‘কালচারাল কনফ্লিক্ট’ পজিশনে আছি। এটি নারীর জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক। সব ধরনের ভায়োলেন্সের প্রাথমিক শিকার হন নারী, সেটি সে শিশু হোক কিংবা পরিণত বয়সের হোক। কন্যাশিশু বা নারীবিষয়ক বা নারীর অধিকার-সংক্রান্ত দিবসগুলো উদযাপনের মাহাত্ম্য তো আছেই, সেই সঙ্গে করণীয় নির্ধারণ করা জরুরি। রাষ্ট্র যদিও কোনো গোষ্ঠীর কাছে নতজানু হবে না। বরং ‘একদল’ লোকের তা পছন্দ না হলেও আমরা এটা করব–এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। নারীর সমতা কোনো ইয়ার্কি করার বিষয় নয়। একে রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে যদি প্রতিফলন ঘটাতে না পারি তাহলে শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না। এ জন্য তীব্র দায়বদ্ধতা দরকার আছে বলে মনে করি। রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেবে এবং অন্যরা তা অনুসরণ করবে।
নারীর প্রতি সহিংসতা, মব, ধর্ষণের ঘটনা আগে ঘটেছে। সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হয়েছে। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে এগুলো প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হচ্ছে। খাগড়াছড়িতে ১৪ বছরের শিশুর ধর্ষণের ঘটনায় প্রতিবাদ করায় তিনজন নিহত হয়েছেন। প্রতিবাদ করা যাবে না এবং এর ফলে এ ধরনের ঘটনা–এমন ভয়ানক বার্তাই যাচ্ছে এসবের মধ্য দিয়ে। আমরা এখান থেকে ফিরব কীভাবে, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের কারণ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি না থাকে তাহলে অনেক সময় তা বেশ কঠিন। এ সময়টায় হামলা-ভাঙচুর কারা কীভাবে করছে, তা কেউ জানে না। মানবাধিকার পরিস্থিতিরও গুরুতর অবনতি ঘটেছে।
আমরা জানি, দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয়। অন্য দেশে যেমন–উদাহরণস্বরূপ বেলজিয়ামে নীতিগতভাবে নির্ধারিত আছে, কোনো সংগঠন বা কমিটিতে তিনজন সদস্য থাকলে অন্তত একজন নারী থাকতে হবে, না হলে সেই সংগঠন অনুমোদন পাবে না। আমাদের দেশেও যদি এভাবে আইনগতভাবে নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা যায়, তা ইতিবাচক হতে পারে। তখন রাষ্ট্রীয় নীতিই নারীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিয়ে আসবে। এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো–রাষ্ট্র যেন নারীর সমতা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের বিষয়ে দৃঢ় নীতি গ্রহণ করে।
