করপোরেট খাতে কাঁচা চুক্তির চাকরি
ছবি:: তুহিন হোসেন
মানস চৌধুরী
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০২ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
কর্মজীবী নারীর প্রশ্নটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গোড়াতেই ঠিকমতো উত্থাপিত হয়নি। তার কারণ, বাংলাদেশের কর্মজীবীদের সংকট লিঙ্গ নির্বিশেষে ভয়াবহ রকমের। দ্বিতীয় কারণটা আরও বড়– যখনই এ সংকটের কথা বলা হয়, তখনই পুরো জনগোষ্ঠীকে ভাবা হয় একটা মধ্যবিত্তীয় পেশা জগতের আলোকে। প্রধানত অফিস সংস্কৃতিতে বা মধ্যবিত্তীয় পেশাজীবী জগতে (যাকে ইংরেজিতে ‘হোয়াইট কলার’ পেশাজীবী বলে) সেখানকার সংকটকে বিবেচনা করে প্রশ্নটা করা হয়। এটি সমস্যাজনক। কারণ বাংলাদেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী শ্রমিক নারী–গার্হস্থ্য শ্রমিক তো তারা ছিলেনই শত শত বছর ধরে, এমনকি শিল্পশ্রমিকের একটা পরিবর্ধন হিসেবে, কখনও কখনও উচ্ছিষ্ট হিসেবে তারা বিরাজ করেন। কর্মক্ষেত্রে বেতন-ভাতা ইত্যাদি বাদ দিলেও তারা সমগোত্রীয় পুরুষের তুলনায় অধিক নিগ্রহ, বঞ্চনার শিকার হন।
মধ্যবিত্তীয় পেশার ক্ষেত্রে বা অফিস সংস্কৃতিতে অনেকেই যেটি লক্ষ্য করেন না, সেটি হচ্ছে– মফস্বল ও মহানগরের পরিস্থিতি আলাদা। আরও আলাদা সরকারি বা পাবলিক কর্মক্ষেত্রে চাকরি এবং করপোরেট বা প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি। প্রাইভেট বা করপোরেশন এক জিনিস নয়। সেখানে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আছে, উন্নয়ন সংস্থা আছে। দেশি-আন্তর্জাতিক পার্টনারশিপের উন্নয়ন সংস্থা আছে। একেবারেই বাণিজ্যিক সংস্থাও আছে। চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি জায়গায় পরিস্থিতির ভিন্নতাও রয়েছে।
সরকারি চাকরিগুলোর বেতন-ভাতা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। শিক্ষকদের বেতনের দিক থেকে বৈশ্বিক তালিকার নিচের সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে এখানে সামগ্রিকভাবে চাকরির নিরাপত্তা আছে। এ কারণে নারীর জন্য সরকারি ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হয়ে থাকে। যেসব পরিস্থিতিতে নারীর কর্মক্ষেত্রের সংকট নিয়ে আলোচনাগুলো উঠে আসে, তা বরাবরই লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো প্রাইভেট খাতের। এমন জায়গা থেকে আলোচনাগুলো আসে, যেখানে হয়তো সাধারণ উদারনৈতিক আলোচনায় আশাই করা হয় না। কখনও পত্রিকার অফিস, কখনও টেলিভিশন চ্যানেল, কখনও সাহায্য সংস্থা বা এনজিওর অফিস থেকে। মজার বিষয় হলো, খুবই কম আলোচনায় আসে করপোরেট সেক্টর। এর থেকে কি আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারব, করপোরেট খাতের নারীরা অপেক্ষাকৃত ভালো আছেন? একেবারেই তা নয়। বাস্তবতা খুব উল্টো, বরং সেখানকার ঘটনাগুলো চাকরি হারানোর ঝুঁকির কারণে আলোচনায় আসে কম।
সাম্প্রতিককালেও কিছু ঘটনা আলোচনায় এসেছে। তথাকথিত প্রাইভেট সেক্টর (যার মধ্যে অনেক সেক্টর আছে), সেখানে সাধারণভাবে এই লিঙ্গীয় নিগ্রহগুলো বেশি চালানো সম্ভব হয়। কারণ সেখানকার চাকরিগুলো পাকা নয়, কাঁচা চাকরি-কাঁচা চুক্তির চাকরি। যখন অফিসে একটা খুবই সুসংগঠিত পিতৃতন্ত্রের ঐক্য বজায় থাকে, খুব সহজে চাকরিতে নাজুক পদগুলোর ক্ষেত্রে লিঙ্গাত্মক মাত্রা ব্যবহার করা সম্ভব হয় বেশি এবং ঝুঁকিতেও থাকেন চাকরিজীবীরা বেশি। সেখানকার নিগ্রহ এত তীব্র এবং ঝুঁকিগুলো এত বড় যে, আলোচনাটাও অনেক চাপা থাকে; করপোরেট ম্যাসকুলিনিটি বা পুরুষ আধিপত্য কিংবা পিতৃতন্ত্র সবচেয়ে অতদন্তকৃত; এক অগ্রন্থিত ও অকথিত গল্প।
অফিস সংস্কৃতিতে কতগুলো জিনিস নিশ্চিত হয় না। সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় আইনে সেগুলোর দেখভাল করার বন্দোবস্ত নেই। এখন রাষ্ট্রীয় আইনের কথা আসছে কেন? যখন সমাজ খুবই সহিষ্ণু থাকে, মর্যাদাকর থাকে, আইনের ভূমিকা সেখানে লঘু হয়ে দাঁড়ায়। আমার মনে হয় না আমরা বাংলাদেশে সে রকম ধরনের একটা পরিস্থিতিতে আছি। ফলে আইনের গুরুত্ব আরও বড় হয়ে দেখা দেয়, কর্মচারী, বিশেষ করে নারী কর্মচারী সুরক্ষিত কিনা। উচ্চ আদালত উপযাচক হয়ে ২০০৯ সালে বলেন, প্রতিটি অফিসে একটা যৌন নিগ্রহ বা লিঙ্গীয় নিগ্রহের যে পরিস্থিতি, সেগুলোর নিরোধকল্পে একটা বন্দোবস্ত থাকতে হবে। সেটিও কিন্তু অনায়াসে উচ্চ আদালত করেননি। এর ১০ বছর আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ লোকমাতানো আন্দোলন হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এরপর ১০টি বছর লেগে যায় কিছু কিছু মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবীর তৎপরতায় উচ্চ আদালতকে এ রকম একটা জিনিস জানাতে।
তারপর ১৭ বছর কেটে গেল–বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেই নির্দেশনা মানা হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা চাইলে কারণ হিসেবে খুব সহজেই বলতে পারি– সমাজদর্শন, পুরুষাধিপত্য, পুরুষালি মতাদর্শ, পিতৃতন্ত্র। কিন্তু এ রকম থিমেটিক জায়গায় বলার চেয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি রাষ্ট্র যে সব ধারা, অ্যাফারমেটিভ বা ইতিবাচক আইন–যেখানে নিগ্রহ আছে, বৈষম্য আছে, সেখানে ওগুলোকে বদলানোর জন্য কিছু দেখভাল করা আইনের কতগুলো লালন-পালন করার পরিস্থিতি থাকে, সেটি নেই বাংলাদেশে। ফলে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নারীরা নানা রকমের ঝুঁকিতে আছেন, নানা রকম নিগ্রহে আছেন এবং তুল্যবিচারে সরকারি চাকরির বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি প্রাইভেট সেক্টরে কর্কশ এবং অধিক নিগ্রহমূলক নারীদের জন্য।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- নারী
- কর্মজীবী নারী
