ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নীরব অভিশাপ

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নীরব অভিশাপ
×

সালমা আলী

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৪ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব এবং গভীর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি– এ দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মজীবী নারীরা। আইনি সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও, হয়রানির শিকার নারীর জন্য প্রতিকার পাওয়া এক দুরূহ সংগ্রাম।

কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মৌলিক দায়িত্ব হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা দেখা যায়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য একটি নীতিমালা করা হয়। এ নীতিমালার একটি প্রধান ধারা ছিল–প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণ, অনুসন্ধান এবং সুপারিশ করার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি (ইন্টারনাল কমপ্লেইন সেল) গঠন করতে হবে। বাস্তবতা হলো–১. দেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই এমন কোনো কমিটির অস্তিত্ব নেই। ২. কিছু প্রতিষ্ঠানে কমিটি থাকলেও, সে সম্পর্কে অনেকেই জানেন না বা এ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেল থাকা সত্ত্বেও অভিযোগ জানাতে না আসায় সেটি অকার্যকর হয়ে আছে বলে শিক্ষক ও সংবাদকর্মীরা জানান। ৩. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় র‍্যাগিং বা হ্যারাসমেন্ট সেল তৈরি হলেও, সেগুলো প্রায়ই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।

এই সংকটের মূল সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি; যেখানে একজন নারী বা মেয়েকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং কেবল ‘নারী’ হিসেবে দেখা হয়। ছোটবেলা থেকে পরিবারে ‘তুমি মেয়ে, এটা করবে না’–এ ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে তার ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, তা কর্মজীবনেও তাড়া করে।

এক ১৬ বছর বয়সী মেয়ের উদাহরণ দেওয়া যায়। সে ৬০ বছর বয়সী বসের খারাপ আচরণের পর পুলিশের কাছে গিয়ে উল্টো লাঞ্ছনার শিকার হয়। সমাজের এই মনস্তত্ত্ব এতটাই ভয়াবহ, এমনকি হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়ের পর অনেকের মূল আগ্রহের বিষয় ছিল ‘নারীদের সুন্দরী বলা যাবে না’–এ ধরনের বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে, হয়রানির মূল বিষয়বস্তু নিয়ে নয়।
হয়রানির শিকার হলে প্রতিকার তো মেলেই না, বরং উল্টো কর্মজীবী নারীর জীবন ও জীবিকায় টান পড়ে। বৈষম্য বা নিপীড়নের শিকার নারীরা বিভিন্ন কারণে চুপ থাকতে বাধ্য হন– 
* অভিযোগ করলে চাকরি হারানোর ভয় থাকে।
* অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের ভয়ে বা স্বামী ডিভোর্স দিয়ে দেবে–এই আশঙ্কায় তারা হয়রানির কথা গোপন রাখেন। বাড়িতে উল্টো তাঁকেই দোষারোপ করা হতে পারে।
* অনেক সময় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অভিযোগকারী নারীর পক্ষে না থেকে অভিযুক্ত পুরুষের পক্ষে অবস্থান নেন।

যখন একজন নারী প্রতিবাদ করার সুযোগ পান না এবং অফিস বা পরিবার–কোথাও সঠিক কাউন্সেলিং বা সমর্থন পান না, তখন এই মানসিকভাবে নির্যাতিত নারী একসময় ভয়ানক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারেন। 

সাহসিকতার সঙ্গে সঠিক পদক্ষেপ নিলে কেবল নিজের নয়, প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ এবং অন্যদের জন্যও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ভয়াবহ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন– 
১. হয়রানির শিকার হলে চুপ না থেকে দ্রুত আওয়াজ তুলতে হবে। অবশ্যই যিনি অপরাধ করছেন, তাঁকে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
২. প্রতিষ্ঠানে একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হবে, যেখানে অভিযোগকারী নির্ভয়ে কথা বলতে পারবেন এবং তাঁর অভিযোগ নিয়ে হাসাহাসি করা হবে না। অভিযোগের প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়টি অবশ্যই গোপন রাখতে হবে। 
৩. নিয়মিতভাবে কর্মশালা বা সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মীদের সচেতন করতে হবে কোন আচরণগুলো যৌন হয়রানি, এর শাস্তি কী এবং অভিযোগ প্রক্রিয়া কী।
৪. সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। প্রত্যেক পুরুষকে এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে। এটি কেবল নারীর সমস্যা নয়, গোটা সমাজের সমস্যা।
৫. ২০০৯ সালের নীতিমালা এবং বর্তমানে তৈরি হতে থাকা প্রতিরোধমূলক আইন–উভয়ই যেন কেবল কাগজে-কলমে না থেকে বাস্তবে কার্যকর হয়, তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

লেখক: মানবাধিকার আইনজীবী/ উপদেষ্টা, বিএনডব্লিউএলএ

আরও পড়ুন

×