কর্মজীবী নারীর বহুমুখী সংগ্রাম
মডেল :: ইরা মাসুক; ছবি :: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৫ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কর্মজীবী নারীর ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। দেশের পোশাক শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে শ্রমশক্তির প্রায় ৭০ শতাংশ নারী, যা আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতি দিচ্ছে। এই বিশাল অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে এক কঠিন, নিরন্তর বহুমুখী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। কর্মক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর মতোই সমান সময় ও শ্রম দেওয়ার পরও নারীকে গৃহে ফিরে গৃহস্থালির কাজ, সন্তান সামলানো বা বয়স্কদের দেখভালের ‘দ্বিতীয় শিফট’ শুরু করতে হয়।
পেশায় ব্যাংকার রীতা (ছদ্মনাম) কাজ করেন বিপণন বিভাগে। বাড়ি ফিরে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা, সংসার সামলানো। ছেলেমেয়ে অসুস্থ হলে ছোটখাটো ছুটি দরকার হয়। কর্মক্ষেত্রে সেই মানবিক সহমর্মিতা প্রায়ই মেলে না। কাজের কাঠামোগত নকশা এবং অমানবিক তদারকি রীতার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘসময় ধরে কঠোর সময়সীমার মধ্যে লক্ষ্য পূরণের চাপ তাঁর মধ্যে ক্রনিক অ্যাংজাইটি তৈরি করেছে। এই চাপ তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিতে হয় ওষুধ। এখন তিনি চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এ কাজের মূল্য নির্ধারণে দুটি পদ্ধতির কথা বলেছেন–রিপ্লেসমেন্ট কস্ট: কাজটি করার জন্য অন্য কাউকে নিয়োগ দিলে যে খরচ হতো এবং উইলিংনেস টু অ্যাকসেপ্ট: নারী এ কাজের জন্য কত টাকা নিতে ইচ্ছুক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঘরের কাজে নারীরা যে সময় ব্যয় করেন, সেটির মূল্য বাইরে করা কাজের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি হতে পারে।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেছেন, গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতির অর্থ হলো সমাজে নারীর অবস্থান তৈরি করা এবং তার কাজের মূল্য প্রতিষ্ঠা করা। পরিবারের সদস্যরা এর গুরুত্ব বোঝেন না; যার ফলে নারী প্রায়ই মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এই অর্থনৈতিক অদৃশ্যতা পারিবারিক কাঠামোতে এক ধরনের শোষণের বৈধতা দেয়।
রাজধানী ঢাকার মিরপুরে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় হেলপার হিসেবে কাজ করেন ফারহানা (ছদ্মনাম)। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা ইউনিয়নের যে গ্রামে ছিল তাঁর বাড়ি, সেটি এখন নদীতে বিলীন। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসে শুরু হয় টিকে থাকার নতুন সংগ্রাম। তাঁর স্বামী আরেকটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। আগের গার্মেন্টসে ফারহানার লাইন ম্যানেজার কারণে-অকারণে তাঁর শরীরে স্পর্শ করতেন। কয়েকবার অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি। সহকর্মীরাও চাকরি হারানোর ভয়ে এ বিষয়ে তাঁকে চুপ থাকতে বলেন। এক পর্যায়ে ফারহানা চাকরি ছেড়ে দেন। এখন আরেকটি পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছেন। নিম্ন আয়ের কর্মীদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক শোষণ এবং মানসিক নির্যাতনের চিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, লাইন ম্যানেজারের খারাপ আচরণ এ কারখানাতেও আছে। তবে এখানে অন্তত ফারহানা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন না। এ নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট বলে জানান।
অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকরা যখন যুক্ত হন, চাকরিদাতারা শ্রমিকদের নাজুকতাকে একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন–কর্মঘণ্টা বেশি, মজুরি কম, কথায় কথায় গালাগাল, মৌখিক হয়রানি, নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি মজুরি বৈষম্যও দেখা যায়। তাদের অল্প মজুরির কথা বলে জানিয়ে দেওয়া হয়–‘এ টাকায় কাজ করলে কর, না করলে নাই।’ এ সুযোগ মালিকপক্ষ গ্রহণ করে। মজুরি বৈষম্য হলো ওই নারী শ্রমিকদের সামগ্রিক যে বৈষম্য; সামাজিক, মতাদর্শিক, কাঠামোগত–তারই একটা বহিঃপ্রকাশ।’
কর্মক্ষেত্রে কাঠামোগত বৈষম্য মোকাবিলায় বাস্তবিক প্রভাব সেভাবে দেখা যায়নি। এমনকি গত বছর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীর অভূতপূর্ব অংশগ্রহণের পরও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত। এমনকি জুলাই সনদেও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের মতামতের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে সদ্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন আয়েশা (ছদ্মনাম)। কর্মজীবনের উচ্ছ্বাস খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এক মাস যেতে না যেতেই তাঁর বিভাগের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা আয়েশাসহ আরও কয়েকজন নারী সহকর্মীকে যৌন হয়রানি শুরু করেন। যখন-তখন নিজের কক্ষে ডেকে পাঠানো, ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা, বাজেভাবে তাকানোসহ অনেক রাতে ফোন করা, এসএমএস দেওয়া হয়ে ওঠে অনেকটা সাধারণ ব্যাপার। এক পর্যায়ে কয়েকজন নারী সহকর্মী ডিরেক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ প্রথমে বিষয়টা ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ করতে চেয়েছিল। ওই নারীরা তাতে রাজি হননি। যেহেতু এসব অভিযোগ খুব সহজেই প্রমাণ করা সম্ভব–তাই ওই পুরুষ কর্মকর্তাকে অন্য বিভাগে সরিয়ে নেওয়া হয় কিন্তু শাস্তিমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় যে নারী সহকর্মী সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, তাঁকে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয় এর কয়েক মাস পর।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালত ২০০৯ সালে একটি দিকনির্দেশনামূলক আদেশ জারি করেন, যেখানে সব কর্মক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ গ্রহণকারী কমিটি (আইসিসি) গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়। এই আইনি কাঠামোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুর্বল। অভিযোগ কমিটিগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। চাকরি যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকায় কর্মীরা পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনেক সময় অভিযোগ করেন না। অনেকে চাকরি টিকিয়ে রাখতে অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী দিতে চান না; যার ফলে ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি কর্মক্ষেত্রে হয়রানিকে উৎসাহিত করে; যে কারণে হয়রানি বন্ধে প্রতিরোধমূলক আইন অপরিহার্য।
- বিষয় :
- কর্মজীবী নারী
- লাবণী মণ্ডল
- নারী
