ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স ম সা ম য়ি ক

‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে’

‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে’
×

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫১ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণআন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন নারীরা, যে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর নারীকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দেখা যায়নি। নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসন এবং নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের পদক্ষেপ চিহ্নিত করে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেশকিছু সুপারিশ করে ‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন’। জুলাই সনদ বর্তমানে  নীতিগত দলিল হিসেবে কাজ করছে; যা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অথচ বারবার সরকারের কাছে এ বিষয়গুলো উত্থাপন করা হলেও জুলাই সনদে দেশের ৫১ শতাংশ জনগোষ্ঠী–নারীদের কোনো সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
----------------------------------------------------------------------------------------------

শিরীন হক, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি বলতে গেলে প্রায় শূন্য। এর প্রধান কারণ, এই সমাজে এখনও নারীর প্রতি বিরূপ মনোভাব বিদ্যমান। আমাদের সমাজের অনেক মানুষ নারীর অগ্রগতি পছন্দ করে না। নারী যেন এগিয়ে না যায়, সেটিই যেন তাদের মানসিকতা। তবুও প্রধান উপদেষ্টা কমিশনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি, সুপারিশও জমা দিয়েছি। আমাদের ‘ঐকমত্য কমিশন’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং ‘জুলাই সনদ’-এও আমাদের কোনো সুপারিশের উল্লেখ নেই। মূলত সবকিছু থেকেই আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। কেন বা কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আমরা জানি না। তবে এতটুকু স্পষ্ট, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কাজ ও সুপারিশগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।

নারীর বিষয়টা সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত–শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, অপরাধ, স্থানীয় সরকার, সংবিধান। আমরা যখন নারী সংস্কার কমিশনের কাজ করছিলাম তখন সবার সঙ্গে বসেছি, কিন্তু সংবিধান সংস্কার কমিশন আমাদের সময় দেয়নি। সেটির প্রধান যিনি ছিলেন তিনিই ঐকমত্য কমিশনের প্রধান ছিলেন।

এই সনদের পুরো প্রক্রিয়াটাই এক তামাশা। এতে দু’একজন নারী ছাড়া কাউকে দেখা যায়নি। সেটি দেখে ভাবলাম, কীভাবে চব্বিশের ৫ আগস্টের পর নারীকে অদৃশ্য করা হচ্ছে! অথচ এ আন্দোলন শুরু হলো রোকেয়া হলের মেয়েদের মাঝরাতে তালা ভেঙে হল ছেড়ে বের হওয়ার মধ্য দিয়ে। 

 

হাসনাত কাইয়ূম, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ
জুলাই সনদে কেবল নারী কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা করা হয়নি–এটি পুরোপুরি সঠিক চিত্র নয়। ধরুন নির্বাচন সংস্কার কমিশনের বিষয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার, যেগুলো বিভিন্ন কমিশনের মাধ্যমে প্রস্তাব করা হয়েছে–সেগুলো জুলাই সনদের জন্য যথাযথভাবে বিবেচনা হয়নি। এ ছাড়া কৃষি, শিক্ষা বা যে ছাত্ররা গণঅভ্যুত্থান করল সে  ছাত্রসংক্রান্ত বিষয়গুলো সনদ বা কমিশনের আলোচনার আওতায় আসেনি। গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, এমন বিষয় অনেক। শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রদের আন্দোলন বা অভ্যুত্থানকে মূলকেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে কোনো বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সুতরাং অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অপূর্ণ থেকে গেছে। যেগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের পদ্ধতি এবং কার্যকারিতাসহ পুরো ব্যাপারটি এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

নারীসমাজ বা নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম-আন্দোলন ইতোমধ্যে চলছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। তবে এটিকে আরও প্রভাবশালী ও কার্যকর করতে যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তা নারী নেত্রীরা যথাযথভাবে নেননি। যদি রাজনৈতিক দল বা সরকার এগুলোকে যথাযথভাবে বিবেচনা করত, অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবত দ্রুত ফলাফল পাওয়া যেত। আমি বলব এখনও নারীরা আরও দৃঢ়ভাবে সরকারকে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ রাস্তার আন্দোলন বা জনসচেতনতা তৈরি করলে সরকার বাধ্য হয়ে বিষয়গুলো বিবেচনা করতে পারে। এখন পর্যন্ত যে আন্দোলনগুলো জোরোলোভাবে করা হয়েছে, সেগুলো বিবেচনা করতে সরকার বাধ্য হয়েছে। তবে এটি বলে দেওয়া যায় না অধিকার আদায়ের জন্য শুধু রাস্তায় নেমে যাওয়াই যথেষ্ট। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সরকার এর বাইরের কোনো বিষয়কে বিবেচনা করেনি।

 

অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য
নারী কমিশন যে সুপারিশগুলো করেছিল, তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে বলতে গেলে ৭১টি আশু বাস্তবায়নযোগ্য (আশু করণীয়) সুপারিশ চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে অগ্রগতির তথ্য নেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিতভাবে ফলোআপ করা হচ্ছে। আমাদের জানা অনুযায়ী এতটুকুই অগ্রগতি হয়েছে। তবে বাস্তবে নিয়মিত ফলোআপ ঠিক কতটা হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট নয়। আমরা শুনেছি, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভায় এসব সুপারিশ নিয়ে নিয়মিত আপডেট ও আলোচনা হয়। উদাহরণস্বরূপ দুটি আইন ইতোমধ্যে খসড়া থেকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ‘নারী সুরক্ষা আইন’ এবং ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন’। এই দুটি আইন মন্ত্রিপরিষদে উপস্থাপনের অপেক্ষায় আছে। উল্লিখিত আইন দুটি ওই ৭১টি আশু করণীয় সুপারিশের মধ্যেই ছিল।

যে ‘ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করা হয়েছে, সেখানে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ঐকমত্য কমিশনের কার্যপরিধির বাইরে ছিল এ কমিশন। পরবর্তী সময়ে গঠিত ছয়টি কমিশনের কার্যক্রমই সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, কিন্তু নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনসহ অন্যান্য কমিশনের সুপারিশমালা সেখানে স্থান পায়নি। এমনকি জুলাই সনদেও নারী কমিশনের সুপারিশগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। কেন তা হয়নি, সেটি বলা কঠিন। তবে আমার মনে হয়, মূল নীতিগত দলিলে এ সুপারিশগুলোর অন্তর্ভুক্তি না থাকা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

গ্রন্থনা : রিক্তা রিচি

আরও পড়ুন

×