ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিঃস্ব মানুষের আর্তনাদ

নিঃস্ব মানুষের আর্তনাদ
×

আগুনে পুড়ে গেছে তানিয়ার শেষ সঞ্চয়টুকু

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৪ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

২৭ নভেম্বর, বেলা তখন সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে। ঢাকার কড়াইল বস্তির প্রবেশপথেই পুলিশি ব্যারিকেড, উৎসুক মানুষের ভিড় আর বাতাসে ভাসছে নানান শঙ্কা। রিকশা ছেড়ে হেঁটে ভেতরে ঢুকতেই কানে আসে ঠুকঠাক শব্দ, কোথাও বা চাপা কান্না। গন্তব্য কুমিল্লাপট্টি–দুই দিন আগের ভয়াবহ আগুনে যা এখন শুধুই এক বিমূর্ত ধ্বংসস্তূপ। তখনও বাতাসে পোড়া গন্ধ। 

গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকার মাঝখানে প্রায় ৯০ একর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই কড়াইল বস্তিতে অন্তত ১০ হাজার ঘর ছিল। গত ২৫ নভেম্বর (মঙ্গলবার) বিকেলের এক সর্বনাশা আগুন নিমেষেই প্রায় দেড় হাজার ঘর পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখা শুধু টিন বা কাঠ পোড়ায়নি, পুড়িয়ে দিয়েছে হাজারো নারীর তিলে তিলে জমানো স্বপ্ন, সংসার আর সঞ্চয়। 

আগুন লাগার সময়টা ছিল বিকেল। বস্তির পুরুষেরা তখনও কর্মস্থলে, নারীরা কেউ কাজে, কেউবা সবে ফিরছেন। গৃহকর্মী শিমু কাজ থেকে ফিরে সন্তানদের নিয়ে মাত্র খেতে বসেছিলেন। ভাতের নলা মুখে তোলার আগেই ‘আগুন আগুন’ চিৎকার। জীবন বাঁচাতে ভাতের থালা ফেলে সন্তানদের হাত ধরে এক কাপড়ে ছুটতে হয়েছে তাঁকে। পোড়া ভিটায় দাঁড়িয়ে শূন্যদৃষ্টিতে শিমু বলেন, ‘রান্না কইরা মাত্র বাচ্চাগোরে খাওয়াইতে বসছি, হেই সময়ই আগুন। আমাগো পরানডা ছাড়া আর কিছুই বাঁচে নাই, সব শ্যাষ অইয়া গেল।’ শিমুর মতো একই হাহাকার সদ্য বিবাহিত এক তরুণীর কণ্ঠেও। আগামী মাসেই চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘এক কাপড়ে দৌড় দিছি। আমার বিয়ের একটা শাড়ি ছিল, অনেক শখের–সব শ্যাষ।’
আগুন নেভানোর পর কড়াইল বস্তিসংলগ্ন খামারবাড়ি মাঠ এখন হাজারো মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়। সেখানেই এক কোণে জবুথবু হয়ে বসে আছেন সদ্য মা হওয়া এক নারী। কোলে ক্ষুধার্ত শিশুটি কেঁদেই চলেছে। তাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মতো একটু আড়ালও নেই এই খোলা মাঠে। ওড়না দিয়ে আড়াল তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর চোখেমুখে ঘর পোড়ার যন্ত্রণার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মাতৃত্ব আর সম্ভ্রম রক্ষার আকুতি।

বস্তির জীবন মানেই নিত্যদিনের সংগ্রাম। তানিয়া অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ তুলেছিলেন সংসারের হাল ফেরাতে। সেই টাকায় কিনেছিলেন চার হাজার টাকার চালের বস্তা। তানিয়া বলেন, ‘বাচ্চা দুইটারে বগলে লইয়া জীবন নিয়া দৌড়াইছি। বাচ্চার একটা প্যান্টও নিতে পারি নাই। চালের বস্তাটা খুলেও দেখি নাই। চালের ড্রাম, ঋণের টাকাসহ সব পুইড়া গেছে। ভেবেছিলাম রাতে কিস্তির টাকা শোধ দেব, এখন সব শেষ।’

পান্না নামে আরেক গৃহবধূর গল্পটা আরও করুণ। জুয়াড়ি স্বামীর সংসারে অন্যের বাসায় কাজ করে একটু একটু করে শখের জিনিস আর টাকা জমিয়েছিলেন। আগুনে সব হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে তাঁর আহাজারি, ‘আমার জীবনে সুখ সয় না। বড়লোকের বাসায় কাজ করি; কিন্তু নিজের কিছুই থাকে না। আমাদের জীবনের কি কোনো দাম নাই?’

আগুনের আঁচ থেকে রেহাই পায়নি শিশুদের শিক্ষাজীবনও। ‘মায়ের দোয়া’ স্কুলের ছাত্র কাউসার ধ্বংসস্তূপের দিকে আঙুল তুলে দেখায়, ‘ওই যে, আমাদের স্কুল পুড়ে গেছে। আমাদের বই-খাতা সব পুড়ে গেছে।’ কাউসার যখন পোড়া খাতার পৃষ্ঠা কোড়াচ্ছে, তখন মাদ্রাসাশিক্ষক মাওলানা মাহমুদউল্লাহর কণ্ঠেও শোনা যায় দীর্ঘশ্বাস। তাঁর মহিলা মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনটি পুড়ে ছাই। তিনি বলেন, ‘বেঞ্চ, বই-খাতা, কোরআন শরিফ–সব পুড়ে গেছে। আপনাদের দোয়ায় মাদ্রাসা চলছিল, এখন সব শেষ।’

কড়াইল বস্তিতে আগুন নতুন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ও ২৪ মার্চ–এভাবে বারবার আগুনে পুড়ে নিঃস্ব হয়েছে এখানকার মানুষ। প্লাস্টিক, পলিথিন, টিন ও বাঁশের তৈরি ঘরগুলো একেকটি বারুদের মতো। 

পোড়া ভিটায় দাঁড়িয়ে ১৩ বছর ধরে বস্তিবাসী কুলসুম বেগমের কণ্ঠে ঝরে পড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা। ত্রাণের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ দিয়া কী হবে? কয়দিন পরপর কেন আগুন লাগে? আমরা কি মানুষ না? আমাগোরে কুত্তা-বিলাইয়ের মতো মনে করে। ত্রাণ সব রাস্তায় দিয়া চইলা যায়, কেউ ভেতরে আসে না। আমরা ত্রাণ চাই না, নিরাপত্তা চাই।’

আগুন নিভেছে, তদন্ত কমিটিও হয়তো গঠিত হবে। কিন্তু খোলা আকাশের নিচে কনকনে শীতের রাতে গাদাগাদি করে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর ভাগ্য কি বদলাবে? নিউমোনিয়া ও ঠান্ডাজনিত রোগের ঝুঁকিতে থাকা শিশুগুলোর কী হবে? তানিয়া, পান্না বা কুলসুমরা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে শুধু ত্রাণের প্যাকেট চান না। তারা চান এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে সন্তান বুকে নিয়ে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়; যেখানে আগুনে পুড়ে সব স্বপ্ন শেষ হয় না।

আরও পড়ুন

×