ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বাধার মাঝেই আলো

বাধার মাঝেই আলো
×

স্থানীয়দের সঙ্গে মিনা দাস

ফারহানা আক্তার

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ২০:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

যশোরের কেশবপুরের বালিয়াডাঙ্গায় জন্ম মিনা দাসের। বলা চলে তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপ সংগ্রামের এক দীর্ঘপথ। ছোটবেলা থেকেই বাস্তবতার কঠিন লড়াইয়ে জড়িত তিনি। কখনও পরিবার থেকে, কখনও সমাজ থেকে আবার কখনও নিজের সীমাবদ্ধতা থেকে তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছে জীবনযুদ্ধের, কিন্তু প্রতিবার নিজের মনকে সাহস জুগিয়ে বলেছেন, ‘পারবে, তুমিই পারবে, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য চালাতে হবে এ লড়াই।’

তিনি দলিত জনগোষ্ঠীর ঋষি সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। দলিত মানেই অবহেলিত, নিষ্পেষিত এক জনগোষ্ঠী। তার মধ্যে যদি হয় নিম্ন সম্প্রদায় তাহলে তো কথাই নেই। এ সম্প্রদায়ের নারীরা প্রায়ই কম বয়সেই বিয়ের বৃত্তে আবদ্ধ হন। সামাজিকভাবে নিচু কাজ এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য তাদের জীবনকে সীমিত করে। মিনা দাসের ক্ষেত্রে এ চ্যালেঞ্জ ছিল দ্বিগুণ। তিনি নারী, দলিত এবং জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী। তবুও এসব বাধা তাঁকে থামাতে পারেনি। প্রথম যখন স্কুলে ভর্তি হতে যান তখন শুরু হয় বৈষম্যের কটু কথার আঘাত। দলিত বলে প্রথম সারিতে বসার অধিকার ছিল না। কোনো কোনো শিক্ষক গ্রাম থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অন্যায় মন্তব্য করতেন। তুলনা করতেন জাত ও গোত্র অনুসারে। তারা বলতেন, ‘তোরা মুচি হয়েও স্কুলে আসিস, তোরা কি পারবি, তোরা জুতা সেলাই করবি, বাপ-দাদার পেশায় কাজ করবি, পড়াশোনা তোদের কাজ না’–এ ধরনের কথার মুখোমুখি হয়েও মিনা ভেঙে পড়েননি। বেশির ভাগ মানুষ ভাবত কথা বললেই জাত, সম্মান চলে যাবে। এ বিষয়গুলো তাঁর ভেতরে আরও জেদ তৈরি করত। মিনা বলেন, ‘আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বা জন্মপরিচয় আমাকে ছোট করতে পারবে না। আসল প্রতিবন্ধী হলো সেই মন, যা অন্যকে অবহেলা করে, নিচু মনে করে।’

প্রাথমিক পর্যায়ে ভালো ফল করার পর মিনা মাধ্যমিকে ভর্তি হন। সেখানে একইভাবে বৈষম্য দেখা দিলেও তিনি ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেকে আরও দৃঢ় করেন। প্রতিটি ব্যর্থতা, অবহেলা, কটূক্তি তাঁকে আরও শক্তিশালী করেছে; আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে শুনেছেন অকথ্য ভাষায় গালাগাল। 

স্বাবলম্বী হওয়ার পথে মিনা প্রথমে পোশাকের নকশা থেকে শুরু করে কম্পিউটারে দক্ষতা অর্জন করেন। সবকিছুতে চেষ্টা করেছেন। কখনও হাল ছাড়েননি। দেশ থেকে বিদেশের মাটিতে লড়ে গেছেন নিজের ও নিজের সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য।

মিনা দাস এখন সামাজিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। শিশু অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। গ্রামে নারী ও পুরুষ উভয়ের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করছেন বিষয়গুলো নিয়ে। তাছাড়া সমতা ও উন্নয়ন নিয়ে সচেতন করছেন সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষকে। সম্প্রতি একটি দলিত সংগঠনের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হয়ে মিনা বলেন, ‘যদি আমি পারি, আপনার সন্তানরাও পারবে, তারাও এগিয়ে যাবে সুন্দর আগামীর পথে। প্রতিবন্ধকতা বা দলিত সম্প্রদায় আজ কোনো বাধা নয়।’ 

লেখক : উন্নয়নকর্মী

 

আরও পড়ুন

×