ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঘরের কোণে অবহেলিত নায়কদের গল্প

ঘরের কোণে অবহেলিত নায়কদের গল্প
×

অলংকরণ :: অরবিন্দ হালদার

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের আলো ফোটার আগেই যাদের দিন শুরু হয়, রাতের গভীর অন্ধকারেও যাদের বিশ্রাম মেলে না তারা আমাদের গৃহকর্মী। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে যারা নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন, সে মানুষগুলোই সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। এ বাস্তবতা বদলানোর প্রত্যয় সামনে রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নারীমৈত্রী আয়োজন করেছে ‘গৃহকর্মীদের মর্যাদা ও অধিকারবিষয়ক সম্মেলন ২০২৫’-এর। ১৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে দুই শতাধিক গৃহকর্মী, বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, সমাজকর্মী এবং অধিকারকর্মীরা একত্র হয়েছিলেন এক অভিন্ন দাবিতে–গৃহশ্রমিকদের জন্য মর্যাদা, সুরক্ষা এবং স্বীকৃতি।

বাংলাদেশে গৃহশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এ বিশাল জনশক্তির সিংহভাগই নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্যতম বড় অংশ এ গৃহকর্মীরা। অথচ শ্রম আইন ২০০৬-এর মূলধারায় আজও তাদের পূর্ণাঙ্গ ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ২০১৫ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ প্রণয়ন করা হলেও, আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে আজও তারা ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। নারীমৈত্রীর এ সম্মেলন মূলত এই আইনি শূন্যতা পূরণ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের একটি পদক্ষেপ।

বাস্তবতা কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় মাঠপর্যায়ের কিছু মানুষের জীবনের দিকে তাকালে। রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে থাকেন কুলসুম (৪৫)। প্রতিদিন ভোর ৬টায় তাঁর কাজ শুরু হয়। একে একে পাঁচটি বাসায় কাজ করেন তিনি। ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, মসলা বাটা–বিরামহীন খাটুনি। কুলসুম বলেন, ‘গত ১০ বছর ধইরা এক বাসায় কাজ করি। গত মাসে অসুস্থ হইয়া দুই দিন যাইতে পারি নাই, তাই বেতন কাইটা রাখছে। আমার কোনো ছুটি নাই, ঈদ বা অসুখ–সব দিনই কাজ। আমার যেন শরীর না, মেশিন! আমার কি বিশ্রাম লাগে না?’

কুলসুমের কথাগুলো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। হাজারো গৃহকর্মীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। তাঁর কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই কোনো স্বাস্থ্য বীমা। কাজ শেষে যখন তিনি নিজের ঘরে ফেরেন, তখন নিজের সংসারের কাজ করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট থাকে না। তবুও মাস শেষে যে সামান্য টাকা পান, তা দিয়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে টিকে থাকা দায়। কুলসুমের দাবি সামান্য–একটু সম্মান এবং অসুখ-বিসুখে ছুটির নিশ্চয়তা।

১৩ বছরের কিশোরী মিনাকে কুড়িগ্রামে সীমান্তবর্তী এক গ্রাম থেকে তার বাবা রাজধানীর বনানীর এক বাসায় আবাসিক গৃহকর্মী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন একটু ভালো থাকার আশায়। গৃহকর্তা বলেছিলেন, মিনাকে পড়াশোনা করাবেন। বাস্তবচিত্র ভিন্ন। মিনা এখন সকাল থেকে রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করে। পড়াশোনা তো দূরের কথা, ফ্ল্যাটের বাইরে যাওয়ার অনুমতিও তার নেই। প্রায় ১০ মাস এক রকম কারাগারের মতো অবস্থায় থাকার পর সুযোগ পেয়ে মিনা পালিয়ে যায়। আশ্রয় নেয় কড়াইল বস্তিতে একই গ্রামের এক খালার ঘরে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিনা জানায়, ‘ম্যাডামের ছোট বাচ্চার বয়স পাঁচ বছর, তারে খাওয়াতে দেরি হইলে ম্যাডাম চড় মারে। গ্লাস ভাঙলে খাবার দেয় না। আমি মার কাছে যাইতে চাই, কিন্তু যাইতে দেয় না।’ মিনার মতো হাজারো শিশু গৃহকর্মী চার দেয়ালের ভেতরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে বাসন মাজা আর ঘর মোছার আড়ালে। শিশুশ্রম নিয়ে আইন থাকলেও তার বাস্তবায়ন সেভাবে চোখে পড়ে না। 

সম্মেলনে জীবনের এ গল্পগুলোই বিভিন্নজনের কথায় উঠে এসেছে। বক্তারা কেবল সমস্যার কথাই বলেননি; বরং সমাধানের পথও দেখিয়েছেন। নারীমৈত্রী দেশব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধি, গৃহকর্তাদের শিক্ষিত করা এবং গৃহশ্রমিকদের ন্যায্য আচরণের জন্য জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ নারীমৈত্রী একা সম্পাদন করছে না। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে ক্রিশ্চিয়ান এইড বাংলাদেশ, আমরাই পারি এবং সহায়। গৃহশ্রমিকরা কার্যত আমাদের সমাজের মেরুদণ্ড। তাদের শ্রম ছাড়া আমাদের নাগরিক জীবন অচল। ৪০ লাখ গৃহশ্রমিককে অন্ধকারে রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নারীমৈত্রীর এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি। কারণ, টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্রই হলো–‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’।

গত ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁওয়ের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে ‘অনানুষ্ঠানিক প্রান্তিক আনুষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিক সম্মেলন ২০২৫’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক সংখ্যা ৮৫ শতাংশ। এর ফলে তারা অধিকাংশ অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকেন। চা শ্রমিক, মৎস্যজীবী বা গৃহশ্রমিকদের অবদান ছাড়া আজকের অর্থনীতি চলবে না। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই শুধু আনুষ্ঠানিক খাত দেখেন, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের অবদান বিবেচনা করেন না। এর ফলে অর্থনীতির অসাবধানতার কারণে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের অবদান জানা হচ্ছে না এবং অবদান না জানার কারণে তাদের স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে না।’

এর আগে গত ২৫ অক্টোবর এফডিসিতে গৃহকর্মীদের অধিকার সুরক্ষা নিয়ে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ও গণসাক্ষরতা অভিযানের যৌথভাবে আয়োজিত ছায়া সংসদে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক বলেন, ‘গৃহকর্মীর মজুরি ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। আগামীতে যারা সরকার গঠন করবে তাদের কর্মপরিকল্পনায় ন্যায়পাল নিয়োগ এবং গৃহকর্মী সুরক্ষায় আইনি কাঠামো তৈরি অগ্রাধিকার পাবে বলে আশা করি। অনেক ক্ষেত্রেই গৃহকর্মীদের বুয়া হিসেবে সম্বোধন করা হয়। এ ধরনের অমর্যাদামূলক ও আপত্তিকর শব্দ পরিহার করা উচিত। গৃহকর্মীদের নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে তাদের সামাজিক স্বীকৃতি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।’

আরও পড়ুন

×