নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ কমছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে
অলংকরণ:: বোরহান আজাদ
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০২৫ সালটি বাংলাদেশের নারীর জন্য ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের বছর। জুলাই-পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্নে যখন রাষ্ট্র সংস্কারের জোয়ার বইছিল, ঠিক তখনই নারীরা দেখল মুদ্রার উল্টো পিঠ। পরিসংখ্যানের পাতায় বিশ্বজুড়ে জেন্ডার সমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও মাগুরা থেকে সুনামগঞ্জ–তৃণমূলের নারীর জীবনে সেই সমতার ছোঁয়া লাগেনি। বরং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সুযোগ আর গভীর পুরুষতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের দ্বন্দ্বে নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালটি নারীর জন্য ছিল কেবলই ‘টিকে থাকার লড়াই’।
সংস্কারের স্বপ্ন বনাম রক্ষণশীলতার দেয়াল
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের হাত ধরে রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তাতে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দেয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ‘নারীপক্ষ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন হকের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের ‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হয়। কমিশন ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন জমা দেয়।
এ প্রতিবেদনে ৪২৩টি সুপারিশ ছিল, যার মধ্যে অভিন্ন পারিবারিক আইন, পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর সম-উত্তরাধিকার, বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং যৌনকর্মীদের ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃতির মতো সাহসী প্রস্তাবনা ছিল। এই সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখার আগেই রক্ষণশীল ও ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর প্রবল বাধার মুখে পড়ে।
হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল একে ‘পশ্চিমা এজেন্ডা’ ও ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে রাজপথে বিশাল সমাবেশ করে। কমিশনের সদস্যদের ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি এবং অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার শিকার হতে হয়।
শিরীন হক বলেন, ‘‘আমাদের ৪২৩টির মধ্যে তিনটি সুপারিশ নিয়ে একটি বিশেষ মহল সমালোচনার ঝড় তুলল এবং নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ও কমিশনের প্রতিবেদন বাতিলের দাবি করল। আমাদের আকাঙ্ক্ষা–বাংলাদেশ হবে একটি ‘ইহজাগতিক, গণতান্ত্রিক এবং মানবিক রাষ্ট্র’, যা সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মানবিক রাষ্ট্রের ধারণাকে শক্তিশালী করতে আমরা মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দিয়েছি, যা কমিশনকে কেবল ‘নারীবাদী সংস্কার কমিশন’ হিসেবে নয়; বরং বিস্তৃত মানবাধিকার আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক নতুন ব্যবস্থার জন্য সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎযোগ্য করা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।’’

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘এখন নারী আন্দোলনের বেশির ভাগ মনে করেন, ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নারীর জন্য আসন সংরক্ষিত রেখে ‘সরাসরি নির্বাচন’ দিতে হবে। আসন সংরক্ষণ রাখলে তা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে, অন্যথায় নয়। অন্যদিকে, সাধারণ ৩০০ আসনে মনোনয়নের ৩৩ শতাংশ নারী রাজনৈতিক কর্মীদের দিলে পরবর্তী চতুর্দশ সংসদে নারী আসন না রাখলেও চলবে। এবার সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা নির্বাচনের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন। নারী আন্দোলনের পক্ষ থেকে সর্বশেষ এই প্রস্তাব এসেছে, যা খুব ইতিবাচক। এই পদ্ধতি শুরু থেকে করা হলে এতদিনে ৩০০ আসনের ৫০ শতাংশ আসনেই নারী প্রার্থী নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভাবতে পারত।’
অর্থনীতির ‘পিংক ট্যারিফ’ ও নারীর নীরব কান্না
২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড তৈরি পোশাকশিল্প এক অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী ছিলেন নারী শ্রমিকরা। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনে পোশাক রপ্তানির ওপর শুল্ক ১৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ হওয়ার উপক্রম হয়। অর্থনীতিবিদরা একে ‘পিংক ট্যারিফ’ বা নারীর ওপর শুল্ক আঘাত হিসেবে অভিহিত করেন।
শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক তৎপরতায় শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও বছরজুড়ে কারখানাগুলোতে চলেছে ‘সাইলেন্ট লে-অফ’ বা নীরব ছাঁটাই। অনেক নারী কাজ হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন; যা পরিবারের অনেক কন্যাশিশুকে দারিদ্র্য ও বাল্যবিয়ের চক্রে ঠেলে দিয়েছে।
মব সহিংসতা ও বিচারহীনতা
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র–আসক, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি–এইচআরএসএস এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন–এমএসএফের বার্ষিক প্রতিবেদনগুলো ২০২৫ সালকে নারী ও শিশুর জন্য ‘বিভীষিকাময়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির সংস্কৃতি নারীর নিরাপত্তাহীনতাকে গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে যায়।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ঘটনাটি ছিল এই বর্বরতার চূড়ান্ত রূপ। সেখানে চুরির অপবাদ বা তুচ্ছ অজুহাতে এক নারীকে বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি কেবল একটি অপরাধ নয়, যা ছিল নারীর মর্যাদার ওপর চূড়ান্ত আঘাত।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র
আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৮০টি ছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণ। এমএসএফের হিসাবে এই সংখ্যা আরও বেশি। আসকের হিসাবে, ৫৬০টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ২১৭ জন নারী। বছরজুড়ে এক হাজার ২৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ জন শিশুকে।
স্বাস্থ্য সংকট ও আন্তর্জাতিক প্যারাডক্স
জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ায় নারীর মাতৃস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য ছিল ভয়াবহ ঝুঁকিতে। সুনামগঞ্জের মতো বন্যাপ্রবণ এলাকায় নারীর মধ্যে ‘ক্লাইমেট এনজাইটি’ বা জলবায়ুজনিত উদ্বেগ মহামারি আকার ধারণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজননক্ষম নারীর ২০.৪ শতাংশই বিষণ্নতায় ভুগছেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য (২৪তম স্থান) দেখালেও তা মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সুবাদে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একে ‘ভ্রান্ত স্বস্তি’ বলে অভিহিত করেছে। কারণ অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তার সূচকে বাংলাদেশের নারীরা এখনও তলানিতে।
উত্তরণের পথ
২০২৫ সালের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মানবাধিকার কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন–
১. বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ পরিহার করতে হবে।
২. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলা ও গণগ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে।
৩. মব সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইনানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ বাতিল বা সংশোধন করতে হবে।
২০২৫ সাল শেষে বাংলাদেশের নারীরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের তকমা, অন্যদিকে ঘরে-বাইরে নিরাপত্তাহীনতার বাস্তব দহন। ২০২৬ সালের নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় নারীর এই অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিই হবে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক। রাষ্ট্র যদি নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত না করে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিস্তৃত হতে থাকে, তবে নারীর এই ‘টিকে থাকার লড়াই’ ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
- বিষয় :
- নারী
- নারী অধিকার
- নারীর ক্ষমতায়ন
- শাহেরীন আরাফাত
