ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শিশুর সঙ্গে জেন্ডার সমতা নিয়ে আলাপ করবেন যেভাবে

শিশুর সঙ্গে জেন্ডার সমতা নিয়ে আলাপ করবেন যেভাবে
×

বাবার সঙ্গে রান্নাঘরে কাটানো কিছু মুহূর্ত হয়তো একটি শিশুর মানস গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বেশির ভাগ শিশু অক্ষরজ্ঞান বা বই পড়া শেখার অনেক আগেই একটি কথা শিখে ফেলে– ‘ছেলেরা শক্তিশালী আর মেয়েরা দুর্বল।’ আপনি বেলজিয়ামের কোনো ছেলের কথা ভাবুন কিংবা ঘানার কোনো মেয়ের কথা; ঢাকা শহর বা প্রত্যন্ত গ্রামের কথা–ছেলে বা মেয়ে হওয়ার সামাজিক সংজ্ঞা বা ‘স্টেরিওটাইপ’ (গৎবাঁধা ধারণা) সারাবিশ্বেই বিদ্যমান। গবেষণা বলছে, তিন বছর বয়স থেকেই শিশুরা আশপাশের জেন্ডার বা লিঙ্গভিত্তিক সংস্কারগুলো নিজের ভেতর ধারণ করতে শুরু করে। ১০ বছর বয়সের মধ্যে ছেলেরা নিজেদের ‘নেতা’ ভাবতে শেখে আর মেয়েরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তাদের সক্ষমতা যে সীমিত–এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১০ জনের মধ্যে ছয়জন ছেলেই মনে করে ‘খেলাধুলায় প্রাকৃতিকভাবেই ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে সেরা।’ এর ফলাফল ভয়াবহ–১৪ বছর বয়সের মধ্যে ছেলেদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে মেয়েরা খেলাধুলা ছেড়ে দেয়। তাই জেন্ডার সমতা বা লিঙ্গসাম্য নিয়ে আলাপটা একেবারে ছোটবেলা থেকেই শুরু করা জরুরি। তবে অনেক অভিভাবক বা শিক্ষকই বুঝে উঠতে পারেন না, শুরুটা করবেন কীভাবে।

‘জেন্ডার সমতা’ কী?
সহজ কথায়, জেন্ডার সমতা হলো এমন একটি ধারণা যেখানে নারী-পুরুষ, ছেলে-মেয়ে এবং ট্রান্সজেন্ডার বা নন-বাইনারি–সব লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের সমান অধিকার, দায়িত্ব এবং সুযোগ থাকবে। এর অর্থ এই নয় যে সবাই হুবহু ‘এক’ হয়ে যাবে; বরং এর অর্থ হলো প্রতিটি মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে সমান শ্রদ্ধার চোখে দেখা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতা বিশ্বের কোথাও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বর্তমান গতিতে চললে বিশ্বব্যাপী এটি অর্জন করতে আরও প্রায় ৩০০ বছর লেগে যেতে পারে। অথচ এটি কেবল ‘ন্যায্যতা’র প্রশ্ন নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজের ভিত্তি। নিচে শিশুদের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার ছয়টি কার্যকরী উপায় তুলে ধরা হলো–
১. কঠিন আলোচনা এড়িয়ে যাবেন না
জেন্ডার সমতা বা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে সংকোচ করবেন না। শিশুর সঙ্গে ন্যায়বিচার এবং সমতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা তাদের পৃথিবীকে বুঝতে সাহায্য করে। এই আলোচনা কোনো ধরাবাধা স্ক্রিপ্ট মেনে করতে হবে না। বই পড়া, সিনেমা দেখা বা ঘরের কাজ করার সময় স্বাভাবিকভাবেই এ প্রসঙ্গগুলো তোলা যায়।

২. শব্দ চয়নে সতর্ক হোন
আমরা শিশুদের সামনে কী শব্দ ব্যবহার করছি, তা তাদের মনোজগৎ গঠন করে। ‘ছেলেরা কাঁদে না’, ‘মেয়েটা বড্ড হুকুম চালায়’ কিংবা ‘মেয়েদের মতো আচরণ করো না’–এই কথাগুলো আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এগুলো শিশুর মনে লিঙ্গবৈষম্যের বীজ বুনে দেয়।
এ ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষা ব্যবহার করুন। মেয়েদের শুধু ‘সুন্দর’ না বলে তাদের বুদ্ধিমত্তা বা সাহসের প্রশংসা করুন। ছেলেদের ‘আবেগ লুকাতে’ উৎসাহিত করার বদলে তাদের অনুভূতি প্রকাশকে ‘সাহসিকতা’ হিসেবে প্রকাশ করুন।

৩. ঘরের কাজ সবার দায়িত্ব
শিশুরা দেখে শেখে। তারা যদি দেখে বাবা সোফায় বসে টিভি দেখছেন আর মা একা রান্নাঘরে ঘামছেন, তবে তারা শিখবে–এটাই নিয়ম। কিন্তু যদি দেখে মা-বাবা দুজনেই ঘরের কাজ ভাগ করে নিচ্ছেন, তবে তারা শিখবে– পরিবারের কাজে সবার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী নারীরা পুরুষের চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ বেশি বিনা বেতনের গৃহস্থালি কাজ করেন। একটি পারিবারিক ‘কাজের তালিকা’ তৈরি করুন এবং প্রতি সপ্তাহে দায়িত্ব অদলবদল করুন। কাজকে শাস্তি হিসেবে নয়; বরং একে অপরের যত্ন নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করুন।

৪. বাস্তবজীবনের রোল মডেলদের গল্প বলুন
শিশুকে এমন মানুষের উদাহরণ দিন যারা গৎবাঁধা নিয়ম ভেঙে এগিয়ে গেছেন। বেগম রোকেয়া, ইলা মিত্র, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ক্লারা জেটকিনের মতো ব্যক্তিত্বদের গল্প বলুন। ছেলেদের ক্ষেত্রেও এমন পুরুষ রোল মডেল বেছে নিন, নারীর প্রতি যার সম্মান ও সহযোগিতার মানসিকতা রয়েছে।

৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা
আজকের শিশুরা অনলাইনে প্রচুর সময় কাটায়। অনলাইন জগতেও অফলাইনের মতোই বৈষম্য বিদ্যমান। বিশেষ করে কিশোরী ও নারীরা অনলাইনে বেশি হয়রানির শিকার হয়। কিছু ক্ষতিকর অনলাইন কমিউনিটি ছেলেদের শেখায়, নারী পুরুষের চেয়ে হেয় এবং জেন্ডার সমতা পুরিষের জন্য হুমকি। এই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা থেকে শিশুকে রক্ষা করতে তাদের মধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং’ বা যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এজন্য সন্তানের সঙ্গে ‘মিডিয়া ডিটেকটিভ’ বা গোয়েন্দা হোন। তাদের পছন্দের কোনো ইউটিউব ভিডিও বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে বিশ্লেষণ করুন। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন।

৬. খেলাধুলায় মেয়েদের উৎসাহিত করুন
খেলাধুলা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক মেয়ে খেলাধুলা ছেড়ে দেয়। তবে দিন পাল্টাচ্ছে। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমাদের দেশের সাবিনা-কৃষ্ণারা কিন্তু পুরুষ খেলোয়াড়দের মতো মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মেয়েরা যখন মাঠে অন্য মেয়েদের জয়ী হতে দেখে, তখন তাদের নিজেদের ওপর বিশ্বাস বাড়ে আর ছেলেরা যখন মেয়েদের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখে, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। পরিবারসহ মেয়েদের খেলা (যেমন নারী ক্রিকেট বা ফুটবল) স্টেডিয়ামে গিয়ে অথবা টেলিভিশনে দেখুন। মেয়েদের নতুন কোনো খেলায় অংশ নিতে উৎসাহিত করুন। ফলাফলের চেয়ে তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করুন।

জেন্ডার সমতা কোনো এক দিনের লড়াই নয়, এটি প্রতিদিনের চর্চা। আপনার আজকের ছোট একটি কথোপকথন, একটুখানি সচেতনতা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বৈষম্যহীন, সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে।

তথ্যসূত্র: ইউএন উইমেন, ইউনিসেফ এবং সমসাময়িক গবেষণা প্রতিবেদন অবলম্বনে
 

আরও পড়ুন

×