ইউনিসেফের প্রতিবেদন
যুদ্ধবিরতির মধ্যেও শিশুর মৃত্যুমিছিল
গাজার ধ্বংসস্তূপে শিশুর শৈশব ছবি :: ইউনিসেফ
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাজার আকাশ আগের মতো আর ঘন ঘন কেঁপে উঠছে না যুদ্ধবিমানের গর্জনে। বাতাসে বারুদের তীব্র গন্ধ কিছুটা কমেছে, ধুলার আস্তরণও থিতিয়ে এসেছে খানিকটা। গত তিন মাস ধরে চলা একটি ‘ঠুনকো’ যুদ্ধবিরতি আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও, মাটির নিচের বাস্তবতা ভিন্ন। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শৈশব উদ্ধারে মানবিক সংস্থাগুলো তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও, প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই অপ্রতুল।
গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকা। ইউনিসেফের একটি তাঁবুর বাইরে হুইলচেয়ারে বসে আছে পাঁচ বছর বয়সী ছোট্ট তাগরিদ। হাতে তার একটি রঙিন বেলুন, কিন্তু চোখেমুখে একসময়ের চঞ্চলতার লেশমাত্র নেই। তাগরিদ যখন কথা বলে, তখন তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে হাহাকার, ‘আমি স্কুটার আর সাইকেল চালাতে খুব ভালোবাসতাম। চিড়িয়াখানা আর রেস্তোরাঁয় যাওয়ার দিনগুলো খুব মিস করি। সবুজ পাখি আমার খুব প্রিয়।’ তাগরিদের এই সহজ স্বীকারোক্তি গাজার বর্তমান পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বিশ্বের যে কোনো স্থানের চেয়ে গাজায় মাথাপিছু শিশু অঙ্গহানির হার সর্বোচ্চ। হাজার হাজার শিশু আজ পঙ্গুত্ববরণ করে বেঁচে আছে; যাদের অনেকেই এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ শিকার কিংবা যুদ্ধের কারণে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে আজ চিরতরে অক্ষম। তাদের শৈশব আজ হুইলচেয়ার আর ক্রাচে বন্দি।
ইউনিসেফ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৬৪ হাজারের বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। বাড়িঘর, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস হওয়ায় পরিবারগুলো নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ৫৬ হাজারের বেশি শিশু তাদের মা অথবা বাবা, কিংবা উভয়কেই হারিয়ে এতিম হয়েছে। গত তিন মাসে বোমাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের তীব্রতা কিছুটা কমেছে, কিন্তু মৃত্যু থামেনি। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির এ সময়টিতেও অন্তত ৬০ জন ছেলে এবং ৪০ জন মেয়েশিশু নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরও শত শত শিশু।
ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার সম্প্রতি গাজায় জরুরি কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চলাকালেও প্রতিদিন গড়ে একজন করে শিশু বা কিশোর নিহত হচ্ছে। এটি কোনো স্বাভাবিক যুদ্ধবিরতি হতে পারে না।’
গাজায় জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ এখনও তাঁবুতে বসবাস করছে। এবারের শীতকালটি ছিল বিশেষভাবে নিষ্ঠুর। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার আল মানশিয়াহ ক্যাম্পের দৃশ্য হৃদয়বিদারক।
অনেকে এমন সব ভাঙা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন যা যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে। আবার অনেকের সম্বল শুধুই পাতলা প্লাস্টিকের তাঁবু, যা কনকনে শীত বা বৃষ্টি প্রতিরোধে একেবারেই অক্ষম। নিরুপায় হয়ে অনেক পরিবার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ধ্বংসাবশেষের কাছেই ফিরে এসেছে, কেউ কেউ তো বিপজ্জনক ‘ইয়েলো লাইন’ বা সীমানা রেখার মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে অবস্থান করছে। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকাটাই এখন তাদের ভবিতব্য।
ভয়ংকর প্রতিকূলতার মধ্যেও ইউনিসেফ ও তাদের সহযোগীরা শিশুর জীবন বাঁচাতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। গত অক্টোবর থেকে মানবিক ত্রাণবাহী চালানের পরিমাণ প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। শিশুকে উষ্ণ রাখতে ইউনিসেফ প্রায় ১০ লাখ থার্মাল কম্বল এবং লক্ষাধিক শীতের পোশাক বিতরণ করেছে। উত্তর গাজার মতো দুর্গম এলাকাগুলোতেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচির প্রথম ধাপে তিন বছরের কম বয়সী ১৪ হাজারের বেশি শিশুকে হাম, মাম্পস, রুবেলা, পোলিও, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন মারণঘাতী রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া গাজাজুড়ে ৭০টি নতুন পুষ্টিকেন্দ্র চালু করায় দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস কিছুটা হলেও পিছু হটতে শুরু করেছে।
গাজার ৯০ শতাংশ স্কুল ভবনই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবুও শিশুদের শিক্ষার আলো থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করা যায়নি। ইউনিসেফ গাজাজুড়ে ১০০টিরও বেশি অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছে, যেখানে এক লাখ ২৫ হাজার শিশু পড়ালেখা করছে। স্কুলগুলোর ওপর চলেছে ইসরায়েলের কাঠামোগত হামলা। তবুও বেইত লাহিয়ার ‘বদর স্কুল’-এর মতো কেন্দ্রগুলোয় শিশুরা আবার বই-খাতা হাতে নিচ্ছে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশছে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলে কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে।
জেমস এল্ডার বলেন, ‘খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব সত্ত্বেও শুধু ফিলিস্তিনিদের মেধার জোরে আমরা পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জরুরি মেরামত করতে সক্ষম হয়েছি।’ বর্তমানে ৫৬টি পানির ট্রাক এবং ১৪টি বিশুদ্ধকরণ প্লান্টের মাধ্যমে প্রতিদিন ৮৩ মিলিয়ন লিটার নিরাপদ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা প্রায় ১৬ লাখ মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে।
জেমস এল্ডার বলেছেন, ‘যে যুদ্ধবিরতি বোমার গতি কমায় কিন্তু শিশুদের কবর দেওয়া বন্ধ করতে পারে না, তা যথেষ্ট নয়। এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই সময় সহিংসতা কমিয়ে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার; যাতে গাজার শিশুদের হত্যা এবং পঙ্গুত্ববরণ চিরতরে বন্ধ হয়।’
তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ প্রেস রিলিজ ও ফিল্ড রিপোর্ট (জানুয়ারি ২০২৬)
- বিষয় :
- গাজা
- গাজায় হামলা
- লাবণী মণ্ডল
