নীরবতা ভেঙে নতুন আলোর পথে
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬
অলংকরণ :: বোরহান আজাদ
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৫:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটা ২৯ জানুয়ারি ২০২৬। বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে দিনটি একটি মাইলস্টোন। দীর্ঘ দেড় যুগের আইনি লড়াই, রাজপথের নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন এবং অসংখ্য নারীর দীর্ঘশ্বাসের বিনিময়ে অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ (আইন), ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন করেছে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সালমা আলীর রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট যে ঐতিহাসিক ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন, দীর্ঘ দেড় দশক তা ছিল অনেকটা ‘দাঁতহীন বাঘ’-এর মতো। দিকনির্দেশনা ছিল, কিন্তু শাস্তির প্রয়োগ ছিল না। সেই নির্দেশনাই পূর্ণাঙ্গ আইনের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে–এই আইন কি কেবলই কাগজের দলিল হয়ে থাকবে, নাকি এটি আমাদের সমাজে শিকড় গেড়ে বসা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সেই উত্তাল ও অন্ধকার দিনগুলোর ক্ষতবিক্ষত অভিজ্ঞতায়, যখন একের পর এক যৌন হয়রানির ঘটনা আমাদের মানবিক মর্যাদার ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আইনটির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করতে হলে আমাদের তাকাতে হবে ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী ও পূর্ববর্তী সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। গণঅভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নারী আন্দোলনকারীদের ওপর যৌন নির্যাতনের হুমকি, ধর্ষণচেষ্টা এবং শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা পুলিশ ও ছাত্রলীগের নির্মম হামলার শিকার হয়েছিলেন। গণআন্দোলনে নারীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, নারীকে রাজনীতি ও রাজপথ থেকে বিবিধ কৌশলে উচ্ছেদ করার এক ঘৃণ্য অপচেষ্টা। অনলাইন ও অফলাইন–উভয় জগতেই নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানি জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। পরিতাপের বিষয় হলো, সে সময় সরকারের পক্ষ থেকেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর বা ইতিবাচক পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।
কেন এই আইন জরুরি? উত্তর দিচ্ছে নিকট অতীতের কিছু নির্মম সত্য। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, শিক্ষাঙ্গন থেকে করপোরেট অফিস– কোথাও নারীরা নিরাপদ নন। প্রতিটি ঘটনা কেবল ব্যক্তি বিশেষের অপরাধ নয়, বরং ‘সিস্টেম’ বা কাঠামোর ব্যর্থতা।
২০২৪ সালের মার্চ মাস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহনন কোনো সাধারণ মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা’। সহপাঠী রায়হান সিদ্দিক আম্মানের ক্রমাগত অনলাইন-অফলাইন বুলিং এবং তৎকালীন সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামের ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা উল্টো ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার সংস্কৃতি অবন্তিকাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। অবন্তিকা বিচার চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রক্টর অফিস তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। নতুন অধ্যাদেশে এ ধরনের প্রশাসনিক অবহেলাকেও শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে; যা আগে ছিল না।
২০২৪ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে এক থিসিস সুপারভাইজার তাঁর ছাত্রীকে ল্যাবের বদ্ধঘরে আটকে রেখে দিনের পর দিন যৌন হয়রানি করেছেন। ছাত্রীর একাডেমিক ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দিয়ে তিনি অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতেন। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সেই শিক্ষক চাকরিচ্যুত হলেও ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়–শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অসম ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পর্ক কীভাবে শোষণের হাতিয়ার হয়।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রূপালী ব্যাংকের এক নারী কর্মকর্তা তাঁর বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে ‘বডি শেমিং’ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। সহকর্মীকে প্রকাশ্যে ‘মোটা’ বলে বিদ্রূপ এবং তাঁর শারীরিক গঠন নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হতো। ভুক্তভোগী জানান, ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনে তাঁর আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছিল। এ ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যৌন হয়রানি কেবল শারীরিক স্পর্শ নয়, বরং নারীসত্তাকে অপমান করাও এর অন্তর্ভুক্ত।
গত বছর ১৯ অক্টোবর রাজধানীর একটি বাসা থেকে এক তরুণী গ্রাফিকস ডিজাইনারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর কর্মস্থল, একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের বাংলা কনটেন্ট এডিটরের বিরুদ্ধে তিনি ও তাঁর ২৬ জন সহকর্মী আগেই লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। বাংলা কনটেন্ট এডিটর নারী সহকর্মীদের শরীর ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলতেন। তরুণীর আত্মহত্যার পর অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও এ ঘটনা প্রমাণ করে, এখনও অধিকাংশ গণমাধ্যম অফিসে কোনো জেন্ডার নীতিমালা বা হাইকোর্টের নির্দেশনা মানার বালাই নেই।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বিশাল অংশজুড়ে আছে অসংগঠিত খাত। গৃহকর্মী, ভাসমান নারীশ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এতদিন ছিলেন আইনি সুরক্ষার পুরোপুরি বাইরে। নতুন অধ্যাদেশে অসংগঠিত খাতের নারীকর্মীদেরও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। আইনজীবী ও নারীপক্ষের সদস্য কামরুন নাহার বলেন, ‘একজন গৃহকর্মী বাসাবাড়িতে নির্যাতিত হলে এতদিন তাঁর যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। এখন ডিসি বা ইউএনওর নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে তিনি অভিযোগ করতে পারবেন।’
মানবাধিকার আইনজীবী বিএনডব্লিউএলএ-এর উপদেষ্টা সালমা আলী ‘সম্মতি’ বা কনসেন্টের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, “কাউকে ‘সুন্দরী’ বলা কি অপরাধ? যদি আমি সেটা ইতিবাচকভাবে নিই, তবে তা নয়। যদি আমার সম্মতি না থাকে এবং তবুও কেউ বারবার আমার রূপ বা শরীর নিয়ে মন্তব্য করতে থাকে, তখন সেটি অবশ্যই যৌন হয়রানি।”
আইন পাস হওয়া মানেই যুদ্ধজয় নয়।
সমাজবিশ্লেষকরা এ অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে তিনটি প্রধান বাধার কথা উল্লেখ করেছেন–
১. এখনও অনেকে জানেন না ঠিক কোন আচরণটি হয়রানির পর্যায়ে পড়ে।
২. নারীর ক্ষমতায়ন আটকাতে একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী সবসময় সক্রিয় থাকে। তারা ভিকটিমকে চাপ দিয়ে আপস করতে বাধ্য করতে পারে।
৩. জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটিগুলো যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তবে এ আইনও অকার্যকর হয়ে পড়বে।
এই অধ্যাদেশ নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। কিন্তু এই নতুন বার্তা সূর্যালোকে সমাজকে আলোকিত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা। কামরুন নাহারের মতে, ‘শিশুকাল থেকেই কারিকুলামে জেন্ডার সমতা ও শ্রদ্ধাবোধের শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
আইন কেবল একটি হাতিয়ার। তবে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনকে ভয়মুক্ত, সম্মানজনক ও মানবিক করে তুলতে দরকার মানবিক সমাজ গঠন। নারীর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার মধ্য দিয়েই কেবল তা অর্জন সম্ভব।
নতুন অধ্যাদেশে যা আছে
• নতুন অধ্যাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো ‘স্থানীয় অভিযোগ কমিটি’ গঠন। এটি প্রান্তিক ও অসংগঠিত খাতের নারীকর্মীদের জন্য আশার আলো।
• ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অন্তর্ভুক্তি: সোশ্যাল মিডিয়া, ই-মেইল বা মেসেঞ্জারে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত এখন আর ‘সামান্য দুষ্টুমি’ নয়। এই অধ্যাদেশে শারীরিক, মৌখিক এবং অমৌখিক (ইঙ্গিতপূর্ণ) আচরণের পাশাপাশি ডিজিটাল বা অনলাইন জগৎকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
• চাকরি বা ক্লাসে যোগদানের শুরুতেই এখন অরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে– কোন আচরণগুলো গ্রহণযোগ্য এবং কোনগুলো ‘অপরাধ’।
• সব কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কমিটিতে নারীদের প্রাধান্য, বাইরের সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
