ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নীলকণ্ঠের ডানায় ঐকতান

নীলকণ্ঠের ডানায় ঐকতান
×

রাফিয়া আক্তার

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৮:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মিরপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ কিশোরী, যার বাবার কাছে নিজের অতি প্রয়োজনীয় আবদারটুকু করতেও একসময় কণ্ঠ কেঁপে উঠত সংকোচে। সেই লাজুক মেয়েটিই যে একদিন নিজের গণ্ডি পেরিয়ে হাজারো নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নসারথি হয়ে উঠবেন–তা কে জানত? তিনি রাফিয়া আক্তার। সংকোচকে শক্তিতে রূপান্তর করে যিনি আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। আজ তিনি শুধু সফল উদ্যোক্তাই নন, বরং ‘নারী উদ্যোক্তা ফোরাম’ ও ‘ঐকতান’-এর মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন হাজারো নারীর আস্থার প্রতীক।

রাফিয়ার এই যাত্রার বীজ রোপিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে, ১৯৯৮ সালে। তখনও ই-কমার্স বা এফ-কমার্সের জোয়ার আসেনি। নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ডিজাইন করেছিলেন চামড়ার ব্যাগের। সেই সময়ে ঢাকার প্রথম সারির সুপারশপ ‘স্টপ এন শপ’-এ পৌঁছে দিয়েছিলেন নিজের তৈরি পণ্য। প্রথম দফার ৫০টি ব্যাগ দুই মাসেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তখন সেটি ছিল কেবলই শখ। সঠিক দিকনির্দেশনা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং পারিবারিক সমর্থনের অভাবে সেই উদ্যোগ খুব বেশি দূর এগোতে পারেনি। 

বিয়ের পর রাফিয়াও গতানুগতিক চাকরিজীবন বেছে নিয়েছিলেন। মাত্র ৯ মাসেই তিনি বুঝতে পারেন, অন্যের অধীনে কাজ করা তাঁর ধাতে নেই। চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্লক ও টাই-ডাইয়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন ‘সলোপ্রেনার’ বা একক উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ার সংগ্রামে নামেন।

চলার পথটা মসৃণ ছিল না। বারবার হোঁচট খেয়েছেন। তবুও হাল ছাড়েননি। ২০১০ সালে মাত্র কয়েকটি ব্লকের ডাইস আর গজ কাপড় নিয়ে নতুন উদ্যমে শুরু করেন তিনি। এরপর ২০১২ সালে পল্লবী ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় নিজের বাসার নিচতলায় মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে চালু করেন তাঁর স্বপ্নের ছোট কারখানা। সেখানেই রয়েছে তাঁর শোরুম।
রাফিয়া আক্তারের ভাষায়, ‘উদ্যোক্তা জীবনে চড়াই-উতরাই থাকবেই। কিন্তু নিজের চেষ্টা, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম করার মানসিকতা নিয়ে লেগে থাকতে হয়। আমি লাভের হিসাব করিনি কখনও, সঙ্গে লসেরও না। হারিয়েছি অনেক প্রিয় সময়, তবুও থেমে যাইনি।’

সফলতার পেছনের গল্পগুলো সব সময় জৌলুসপূর্ণ হয় না। রাফিয়ার গল্পটিও ত্যাগের কালিতে লেখা। পণ্যের উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি বাসে চড়ে যাতায়াত করেছেন। নরসিংদী থেকে কাপড়ের ভারী বস্তা নিজে টেনেছেন। সারাদিন কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য রোদে পুড়েছেন, কখনও কখনও ক্ষুধার্ত পেটে মাত্র দশ টাকার বাদাম খেয়ে দিন পার করেছেন। নিজের তিলে তিলে গড়া এই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন ‘নীলকণ্ঠ’। 

রাফিয়া আক্তার বিশ্বাস করেন, একজন নারীকে শুধু আয় করতে শেখালেই হয় না, তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতেও শেখাতে হয়। তাঁর স্বপ্ন, ‘ঐকতান’ হবে দেশের এমন এক নির্ভরযোগ্য মার্কেটপ্লেস, যেখানে দেশের প্রতিটি প্রান্তের নারী উদ্যোক্তারা সম্মানের সঙ্গে তাদের পণ্য পৌঁছে দিতে পারবেন ক্রেতার কাছে। 
 

আরও পড়ুন

×