বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে লুৎমিলা আহমেদের নেতৃত্ব
লুৎমিলা আহমেদ
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ১৯:১৮
সাপ্লাই চেইনের কাজ অনেকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো। কখন ঝড় আসবে, কোথায় চাপ তৈরি হবে, কোন পথে সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে–সবকিছু আগেভাগে বুঝতে পারাই এখানে দক্ষতার মাপকাঠি। ভুল হলে ক্ষতি শুধু সংখ্যায় নয়, গ্রাহকের বিশ্বাসেও পড়ে এর প্রভাব।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের অপারেশনাল সাপ্লাই চেইনে কাজ শুরু করার সময় এই বাস্তবতাই খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিলেন লুৎমিলা আহমেদ। প্রতিদিনের পরিকল্পনা, উৎপাদন, মজুত এবং বাজারের চাহিদা–সবকিছুর মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য সমন্বয় থাকে। সেই সমন্বয় ভেঙে গেলে পুরো ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হতে পারে। অনিশ্চয়তার মধ্যে এই জটিল সম্পর্কগুলো বোঝা এবং সেই অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সাপ্লাই চেইন পেশাজীবীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুৎমিলা আহমেদ ধীরে ধীরে এই দক্ষতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশ থেকে শুরু হওয়া সেই পথ এখন পৌঁছেছে বহুদেশীয় নেতৃত্বের জায়গায়। বর্তমানে ইউনিলিভারের প্ল্যানিং এক্সিলেন্স লিড হিসেবে পাকিস্তান, তুরস্ক, আরব অঞ্চল ও বাংলাদেশজুড়ে পরিকল্পনা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। প্রতিটি বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন–ভোক্তার আচরণ, সরবরাহ কাঠামো, অর্থনৈতিক পরিবেশ–এমনকি সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও আলাদা।
তবে এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও দুটি বিষয়কে সবখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন লুৎমিলা আহমেদ। তাঁর মতে, সঠিক তথ্য নেতৃত্বকে দিকনির্দেশনা দেয়, আর মানুষের ওপর বিশ্বাস দলকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যায়। নেতৃত্বের আসল শক্তি এখানেই–অনিশ্চয়তার সময়েও সবাইকে একই লক্ষ্য ধরে রাখার সক্ষমতা।
গত কয়েক বছরে সাপ্লাই চেইনের কাজের ধরনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা হতো প্রতিক্রিয়াভিত্তিক–সমস্যা দেখা দিলে সমাধান খোঁজা হতো। এখন গুরুত্ব পাচ্ছে আগাম পূর্বাভাস।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিমান্ড সেন্সিং এবং সিমুলেশন প্রযুক্তির ব্যবহার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক সময় একটি পণ্যের চাহিদা কমার আগেই তার সংকেত পাওয়া যায়। লুৎমিলা আহমেদের মতে, এই রিয়েল-টাইম তথ্য ও দৃশ্যমানতা সাপ্লাই চেইনের পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইনভেন্টরি অপ্টিমাইজেশন, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্যবস্থাপনা এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া–সব ক্ষেত্রেই এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, একটি শক্তিশালী সাপ্লাই চেইনের মূল ভিত্তি থাকে সঠিক পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনাকে কার্যকর রাখতে তিনটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রথমত, প্রতিটি বাজারের জন্য আলাদা কৌশল। বাংলাদেশের বাজারে যে পরিকল্পনা কাজ করে, আরব অঞ্চলে সেটি একইভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সবসময় বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা। একটি পরিকল্পনার ওপর পুরো কাঠামো নির্ভর করলে অপ্রত্যাশিত ধাক্কায় তা সহজেই ভেঙে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, সাপ্লাই, ফাইন্যান্স এবং কমার্শিয়াল টিমের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করা। কারণ, আলাদা আলাদা ভালো পরিকল্পনাও সমন্বয় না থাকলে সফল হয় না।
এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক দক্ষতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে অতিরিক্ত উৎপাদন কমে, অপ্রয়োজনীয় পরিবহন কমে, ফলে সম্পদের ব্যবহারও আরও দক্ষ হয়। তাঁর মতে, ব্যবসায়িক উৎকর্ষ এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতা অনেক ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্তের ভেতরে মিলিত হয়।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন লুৎমিলা আহমেদ। ইউনিলিভার বাংলাদেশে জেন্ডার ব্যালান্সকে শুধু একটি লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নয়, বরং কর্মসংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখা হয়। নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা তৈরিতে বৈচিত্র্যের গুরুত্ব রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
নারী সহকর্মীদের নেতৃত্ব বিকাশে তিনটি বিষয়কে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনন–লক্ষ্যভিত্তিক মেন্টরিং, ক্রস-ফাংশনাল অভিজ্ঞতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সহায়ক কর্মপরিবেশ। তাঁর মতে, দৃশ্যমানতা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। তাই গুরুত্বপূর্ণ উপস্থাপনা, আঞ্চলিক প্রকল্প বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় নারী সহকর্মীদের সরাসরি যুক্ত করা প্রয়োজন।
নিয়মিত মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে সহকর্মীদের ক্যারিয়ারের লক্ষ্য বোঝা এবং সেই অনুযায়ী নতুন চ্যালেঞ্জের সুযোগ তৈরি করাও তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভবিষ্যতের করপোরেট বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নারীকে প্রযুক্তি, অপারেশন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো কৌশলগত ক্ষেত্রেও দক্ষতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো শক্তিশালী পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরি করা, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখা এবং ক্রমাগত নিজেকে নতুন জ্ঞান ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করা।
তাঁর দৃষ্টিতে নেতৃত্ব কখনও শুধু একটি পদবির বিষয় নয়। এটি মূলত প্রভাব তৈরির ক্ষমতা–মানুষকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিই নেতৃত্ব।
আর সেই শক্তি তৈরি হয় যখন দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করে। তাঁর যাত্রা সেই সমন্বয়েরই একটি বাস্তব উদাহরণ–বাংলাদেশ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের নেতৃত্ব পর্যন্ত।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ
- ইউনিলিভার
- দক্ষতা উন্নয়ন
