পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপন্নদের আস্থার প্রতীক
‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার’
সুলতানা শারমীন
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ের এই শান্ত-সবুজ রূপের আড়ালে জেন্ডারভিত্তিক বা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো এক ভয়ানক রূঢ় বাস্তবতা যেন গভীরভাবে শিকড় গেড়ে আছে। বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ (এমজেএফ)-এর একটি জরিপ আমাদের সামনে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। জরিপ অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের ৪৪ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক নারী নানা ধরনের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতন এবং ৩৮ শতাংশ ভয়াবহ মানসিক নিপীড়নের শিকার। এই শিউরে ওঠা পরিসংখ্যানই বারবার মনে করিয়ে দেয়–সহিংসতার শিকার এই নারীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় এবং সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি।
সময়ের এ জোরালো দাবি মেটাতেই পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ের নারীদের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার’ (ভিএসসি)। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অর্থায়নে এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের ‘ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ডেভেলপমেন্ট ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস’ (ইআরআরডি-সিএইচটি) প্রকল্পের আওতায় এ কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদ ও বাংলাদেশ পুলিশের যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত এ কেন্দ্রগুলো মূলত নারী ও শিশুর জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং গোপনীয় আশ্রয়স্থল।
এখানে সহিংসতার শিকার নারীকে শুধু আশ্রয়ই দেওয়া হয় না; বরং তাদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তা এবং স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য জীবনমান উন্নয়নমূলক নানা সহায়তা দেওয়া হয়। এ কেন্দ্রগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে; যাতে প্রতিটি পদক্ষেপে ভুক্তভোগীর সম্মান, নিরাপত্তা ও আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। সম্প্রতি ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি ভিএসসি পরিদর্শন করে দেখেন, কীভাবে পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে ভুক্তভোগীবান্ধব এ সেবাগুলো নিশ্চিত করছেন।
এ ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতা বাড়ানো ও প্রচারণার মাধ্যমে ভিএসসিগুলো পাহাড়ের দীর্ঘদিনের নীরবতার সংস্কৃতি ভেঙে একটি জোরালো বার্তা দিচ্ছে–নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়া প্রতিটি ভুক্তভোগীর জন্মগত অধিকার।
এই কেন্দ্রগুলো কীভাবে মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে, তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সাত বছর বয়সী ছোট্ট শিশু বুবলী (ছদ্মনাম)। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বান্দরবানে ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের শিকার হয় এই অবুঝ শিশুটি। ঘটনার পরপরই স্থানীয় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার এবং উপপরিদর্শক (এসআই) নিলুফা ইয়াসমিনের সময়োপযোগী ও সাহসী হস্তক্ষেপে বুবলীকে দ্রুত উদ্ধার করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তার জন্য নিশ্চিত করা হয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং আইনি সহায়তা।
সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বুবলীর পরিবারকে শুধু সুরক্ষাই দেওয়া হয়নি, তাদের আর্থিকভাবেও সহায়তা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জোরালো প্রমাণের ভিত্তিতে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয় অভিযুক্তকে।
আজ ছোট্ট বুবলী আবারও স্কুলে ফিরেছে। সে তার হারানো শৈশবকে নতুন করে ফিরে পেয়েছে, যা আজ অসংখ্য নিপীড়িত নারী ও শিশুর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। বুবলীর এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি প্রমাণ করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারগুলো শুধু একটি আইনি বা চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং এটি এমন একটি রূপান্তরমূলক প্ল্যাটফর্ম, যা মানুষের গভীর ক্ষতকে অদম্য মনোবল এবং ভয়কে ন্যায়বিচারে পরিণত করছে। পাহাড়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনায় কোনায় এ কেন্দ্রগুলো যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে জীবনের নতুন আলো।
- বিষয় :
- পার্বত্য চট্টগ্রাম
- নারী
