বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়: নারীর প্রতি সহিংসতার অন্তহীন শৃঙ্খল
শাহীন আনাম
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৮ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের নারীরা আজ নানা ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন। তবুও এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে রয়ে গেছে এক গভীর অন্ধকার। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধের ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন এখনও হতাশাজনক। পাশাপাশি, বাল্যবিয়ের মতো গুরুতর সামাজিক ব্যাধিও আমরা কোনোভাবেই নির্মূল করতে পারছি না।
একটি প্রশ্ন প্রায়ই ওঠে–নারীর প্রতি সহিংসতা কি বাস্তবে বেড়েছে, নাকি কেবল অভিযোগ দায়েরের হার বৃদ্ধি পেয়েছে? প্রকৃতপক্ষে, এই বিতর্কের চেয়ে বড় সত্য হলো–সহিংসতা অবিরাম ঘটছে এবং পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোর তুলনায় তা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। অভিযোগ বেশি হচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে আশার কথা হলো, আগের তুলনায় অনেক অভিভাবক এখন আইনের আশ্রয় নিতে আগ্রহী হচ্ছেন। নির্যাতনের শিকার হওয়ার সঙ্গে যে সামাজিক কলঙ্ক বা ‘স্টিগমা’ যুক্ত ছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। এই সচেতনতার কারণেই হয়তো সংবাদমাধ্যমে নারী নির্যাতনের খবর এখন বেশি চোখে পড়ে।
তবুও মুদ্রার উল্টো পিঠটি বেশ অন্ধকার। আমরা জানি, লোকলজ্জার ভয়ে অসংখ্য নির্যাতনের ঘটনা আজও আড়ালেই থেকে যায়। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় একজন নারী, শিশু বা তরুণী যখন যৌন নির্যাতনের শিকার হন, তখন তিনি যে কেবল ভয়াবহ মানসিক আঘাতের (ট্রমা) মধ্য দিয়ে যান, তা নয়; সমাজ ও ক্ষেত্রবিশেষে পরিবারও তাকে এক ভয়াবহ বৈরী পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। এ কারণেই অভিযোগ দায়েরের হার কিছুটা বাড়লেও, বহু অভিভাবক এখনও আইনি লড়াইয়ে যেতে পিছপা হন।
প্রশ্ন জাগে, এই অন্তহীন সহিংসতার মূল কারণ কী? সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, এর সবচেয়ে বড় কারন–‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। সাম্প্রতিক সময়ে ‘রেপ ল রিফর্ম’ বা ধর্ষণ আইন সংস্কারবিষয়ক একটি কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়ংকর চিত্র। এক সময় ধর্ষণের ঘটনায় সাজা পাওয়ার হার ছিল ২ থেকে ৩ শতাংশ; বর্তমানে তা আরও নিচে নেমে এসেছে। এর সহজ অর্থ হলো, অপরাধী অপরাধ সংঘটনের আগেই নিশ্চিত থাকে যে তাকে কোনো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। হয়তো তাকে গ্রেপ্তার করা হবে, কিছুদিন কারাগারেও থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে সে ঠিকই বেরিয়ে আসবে। অপরাধের কোনো দৃশ্যমান পরিণতি বা জবাবদিহি না থাকাই এই সহিংসতা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
দ্বিতীয় বড় কারণটি নিহিত রয়েছে সমাজের মনস্তত্ত্বে–সমাজ নারীকে কীভাবে মূল্যায়ন করে। নারী যে একটি স্বাধীন সত্তা, তারও যে সম্মান ও আত্মমর্যাদা রয়েছে, এই সমাজ বা অনেক ক্ষেত্রে খোদ পরিবারই তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। এর নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটে পারিবারিক সহিংসতার মাধ্যমে। বাইরের জগৎ তো বটেই, একজন নারী বা কন্যাশিশু অনেক সময় তার নিজের ঘরেও নিরাপদ থাকে না।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের আরেকটি ভয়ানক দৃষ্টান্ত হলো বাল্যবিয়ে। এটিও নিঃসন্দেহে নারীর প্রতি এক ভয়ংকর সহিংসতা, যা রোধ করতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এর অন্যতম কারণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। বাল্যবিয়ে ও নারী নির্যাতন রোধে তৃণমূলের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে যেসব প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে, বাস্তবে তার বেশির ভাগই অকার্যকর। এই কমিটিগুলোই যদি দায়িত্ব পালন না করে, তবে এই ব্যাধি রুখবে কে? জাতীয় পর্যায়ে অনেক ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, ব্যয় করা হয়েছে বিপুল অর্থ ও সম্পদ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে এবং এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীবান্ধব ও নারী-সংবেদনশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারলে, সহিংসতার বিরুদ্ধে আমাদের সব লড়াই ব্যর্থ হতে বাধ্য।
পরিশেষে, উত্তরণের পথ খুঁজতে হলে আমাদের গোড়ায় হাত দিতে হবে। প্রথমত, সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর মর্যাদা ও অবদানকে নিঃশর্ত স্বীকৃতি দিতে হবে। নারীর প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির শিকড় উপড়ে ফেলে একটি সত্যিকারের নারীবান্ধব সমাজ ও পরিবেশ বিনির্মাণ করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, বিচারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে তার সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। এই সম্মিলিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলেই কেবল নারী, শিশু ও তরুণীদের প্রতি সহিংসতা এবং বাল্যবিয়ে রোধের দীর্ঘ সংগ্রামে আমরা আলোর দেখা পাব।
লেখক: নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
- বিষয় :
- নারী
- নারী ও শিশু নির্যাতন
