ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উদ্ধার হওয়া নারীর সংকট

উদ্ধার হওয়া নারীর সংকট
×

অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ২০:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংবিধানের পাতায় সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা লেখা থাকলেও, বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে দাঁড়িয়ে একজন নিপীড়িত নারীর আর্তনাদ যেন অনন্ত শূন্যতায় মিলিয়ে যায়। পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি কিংবা পাচারের শিকার হওয়া একজন নারী যখন অন্ধকার ফুঁড়ে আলোর পথে আসতে চান, তখন রাষ্ট্র ও সমাজ তাঁকে কতটা আলো দিতে পারে? ‘উদ্ধার’ হওয়া মানেই কি মুক্তি? নাকি আইনি জটিলতা, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা এবং সামাজিক কলঙ্কের ঘেরাটোপে শুরু হয় আরেক নতুন বন্দিজীবন? নারী সুরক্ষার এ সামগ্রিক ব্যবস্থা, এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা সংকট এবং উত্তরণের পথ নিয়ে লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত
---------------------------------------------------------------------------------

ধরা যাক, নারায়ণগঞ্জের কোনো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠ বা পতিতালয় থেকে পাচার হয়ে যাওয়া এক কিশোরীর কথা। জঘন্য সেই পরিবেশ থেকে সে যখন কোনোমতে একটি ফোন জোগাড় করে বাঁচার আকুতি জানায়, তখন শুরু হয় তাঁকে উদ্ধারের লড়াই। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় তাঁকে হয়তো উদ্ধার করা হলো; সমাজ ভাবল মেয়েটি মুক্তি পেয়েছে। এরপর কী? তাঁর প্রকৃত গন্তব্য কোথায়?

ভিকটিমবান্ধব কাঠামোর অভাব ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, উদ্ধার হওয়া মাত্রই একজন নারীর প্রয়োজন তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা, ট্রমা বা মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার জন্য সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলিং এবং আইনি সুরক্ষা। কিন্তু আমাদের থানাগুলো কি এখনও প্রকৃত অর্থেই ‘ভিকটিমবান্ধব’ বা ‘নারীবান্ধব’ হয়ে উঠতে পেরেছে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর–না।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) উপদেষ্টা ও প্রখ্যাত মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই; আশ্রয়কেন্দ্র আছে কিন্তু সেখানে নেই মানবিক পরিবেশ; বিচারিক কাঠামো আছে কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীকে।’
বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে একজন নারী দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার অভিযোগ করার সাহসই হারিয়ে ফেলেন। তারা বুঝতে পারেন, বিচার চাওয়ার কণ্টকাকীর্ণ পথটি অনেক সময় মূল অপরাধের চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন জরিপও সাক্ষ্য দেয়, দেশে নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীর সিংহভাগই আইনি কাঠামোর বাইরে থেকে যান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাহীনতার কারণে। 

আশ্রয়কেন্দ্র নাকি কারাগার
উদ্ধারের পর একজন নিপীড়িত নারীকে সাধারণত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) বা শেল্টার হোমে (আশ্রয়কেন্দ্র) পাঠানো হয়। কিন্তু এ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ নিয়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক হতাশা। অথচ নিউজিল্যান্ড বা ইউরোপের দেশগুলোয় শেল্টার হোমগুলো হয় একটি বাড়ির মতো, যেখানে নারী তাঁর সন্তান নিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে পারেন, খুঁজে পান মানসিক প্রশান্তি।

আর আমাদের দেশের চিত্র? সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বা সেফহোম যেন একেকটি কারাগার। সালমা আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকারি সেফহোমগুলোয় গেলে ফিনাইল বা ডেটলের কড়া গন্ধ পাওয়া যায়। পরিবেশটা অনেকটা জেলখানার মতো। সেখানে নেই কোনো মুক্ত বাতাস, ন্যূনতম কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই, খেলাধুলার জায়গা বা লাইব্রেরি নেই। পদে পদে থাকে বিধিনিষেধ।’
এমন পরিবেশে একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত নারী কীভাবে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখবেন? যদিও কিছু এনজিও পরিচালিত শেল্টার হোমে পারিবারিক পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকে, তবে সরকারি তহবিলের অপ্রতুলতা এবং অনুদাননির্ভরতার কারণে দেশজুড়ে এর মানোন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।

কাগজে-কলমে আইন, বাস্তবে শূন্যতা 
বাংলাদেশে নারী সুরক্ষায় আইনের কোনো অভাব নেই। ২০১০ সালে প্রণীত ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন’, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কিংবা মানব পাচার প্রতিরোধ আইন–সবই আছে। কিন্তু শর্ষের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভূত। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে একজন নারী যখন আদালতে যান, তখন আইনের বিধান অনুযায়ী তাঁকে ‘প্রোটেকশন অর্ডার’ বা সুরক্ষামূলক আদেশ দেওয়ার কথা এবং প্রোটেকশন অফিসার নিয়োগের কথা। লজিস্টিক সাপোর্ট ও প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাবে এর প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায় এবং পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ কেন্দ্র বা সেল থাকার কথা। বাস্তবে তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। যে কয়টি প্রতিষ্ঠানে কমিটি আছে, সেগুলোও প্রভাবশালীদের চাপে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে আছে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে। সমাজ এখনও অপরাধীর চেয়ে আক্রান্ত নারীকেই বেশি কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। যৌন হয়রানি বা পাচারের শিকার হয়ে ফিরে আসা মেয়েটিকে অনেক সময় তাঁর নিজের পরিবারই গ্রহণ করতে চায় না। এমন সময়ে রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ব্যবস্থা কেমন? একেবারেই শূন্যের কোঠায়। একটি মেয়েকে উদ্ধার করে শেল্টার হোমে কিছুদিন রেখে আবার সেই অসুরক্ষিত পরিবেশেই ছেড়ে দেওয়া হয়। তার অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার জন্য ‘বিকল্প কর্মসংস্থান’ বা দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের কোনো রূপরেখা আমাদের রাষ্ট্রীয় বাজেটে নেই। ফলে বাঁচার তাগিদে সেই নারী হয়তো আবারও পুরোনো অন্ধকার জগতেই ফিরে যেতে বাধ্য হন।

দরকার একটি সমন্বিত রোডম্যাপ
নারীর সুরক্ষাকে যদি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে হয়, তবে উদ্ধার থেকে শুরু করে আইনি বিচার এবং চূড়ান্ত পুনর্বাসন–পুরো ব্যবস্থাটিকে একটি ছাতার নিচে আনতে হবে। সালমা আলী দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে পুনর্বাসনের একটি রোডম্যাপ উল্লেখ করেছেন। তা হতে পারে এমন– উদ্ধার ➔ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ➔ মানসিক কাউন্সেলিং ➔ আইনি সহায়তা ➔ নিরাপদ আশ্রয় ➔ বিকল্প কর্মসংস্থান ➔ সমাজে সসম্মানে পুনর্মিলন। এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ– 
১. কমিউনিটিভিত্তিক শেল্টার হোম: জেলখানার মতো সরকারি সেফহোমের বদলে প্রতিটি উপজেলা ও জেলায় খোলামেলা, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য ‘কমিউনিটিভিত্তিক শেল্টার হোম’ গড়ে তুলতে হবে। মেয়েরা কমিউনিটির কাছাকাছি থাকলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সহজ হয়। 
২. বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ: নারী পুনর্বাসন এবং তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য জাতীয় বাজেটে আলাদা ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। 
৩. ভিকটিম ও উইটনেস প্রোটেকশন আইন: বিচার চলাকালীন নারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ‘ভিকটিম ও উইটনেস প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন ও তার কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। 
৪. হাইকোর্টের নির্দেশনার প্রয়োগ: কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশিকা ও অধ্যাদেশ কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে কার্যকর করতে হবে এবং নিয়মিত সরকারি নজরদারি চালাতে হবে। 
৫. স্পিডি ট্রায়াল বা দ্রুত বিচার: মামলা দিনের পর দিন চলতে থাকলে ভুক্তভোগী হাল ছেড়ে দেন। তাই নারী নির্যাতনের মামলাগুলোয় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রো-অ্যাকটিভ বিচারক ও কাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন।

নারীর জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার আদিম সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রকে তার প্রকৃত অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। তবেই অন্ধকার থেকে উদ্ধার হওয়া একজন নারীর শিকল সত্যি সত্যি ভাঙবে এবং তিনি বাঁচতে পারবেন মাথা উঁচু করে।

আরও পড়ুন

×