ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারীর ওপর জান্তার আরেক যুদ্ধ

মিয়ানমারে স্যানিটারি প্যাড নিষিদ্ধ!

মিয়ানমারে স্যানিটারি প্যাড নিষিদ্ধ!
×

মিয়ানমারে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করেন স্বেচ্ছাসেবীরা ছবি :: ইউনিসেফ

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২১ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মিয়ানমার এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে কামানের গোলাবর্ষণ, গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তার–এসব যেন দেশটির দৈনন্দিন চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সম্প্রতি জান্তা সরকার বিদ্রোহ দমনের নামে এমন এক কৌশল হাতে নিয়েছে, যা শুধু অদ্ভুতই নয়, বরং চরম অমানবিক। সামরিক জান্তা দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীর অতিপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ‘স্যানিটারি প্যাড’ বা ন্যাপকিন সরবরাহ নিষিদ্ধ ও সীমিত করছে। মানবাধিকারকর্মী ও অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি নিছক কোনো সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার ঘটনা নয়; বরং এটি নারীর বিরুদ্ধে এক ধরনের পরিকল্পিত ‘লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’।

সামরিক বাহিনীর দাবি, জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী বা ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (পিডিএফ)-এর যোদ্ধারা এই স্যানিটারি প্যাডগুলো রণক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করছে। নারী অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘সিস্টার্স টু সিস্টার্স’-এর পরিচালক থিনজার শুনলেই ই জানান, সামরিক বাহিনীর ভাষ্যমতে, যোদ্ধারা গুলির ক্ষত থেকে রক্তপাত বন্ধ করতে এবং বুটের ভেতরে ঘাম ও রক্ত শুষে নেওয়ার জন্য স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছে। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক বাহিনীর এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং হাস্যকর। চিকিৎসা সহায়তা প্রদানকারী দাতব্য সংস্থা ‘স্কিলস ফর হিউম্যানিটি’ (এসএফএইচ)-এর প্রতিষ্ঠাতা মেরেডিথ বান বলেন, ‘যুদ্ধে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা যার আছে, সে-ও জানে যে গুলির ক্ষত বা গভীর কাটাছেঁড়ায় স্যানিটারি প্যাড কোনো কাজেই আসে না।’ তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, একটি স্যানিটারি প্যাড কখনও ক্ষতের ওপর স্থির থাকে না, এটি অতিরিক্ত রক্ত শুষে নিতে সক্ষম নয় এবং ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্তও রাখতে পারে না। তাঁর মতে, সামরিক বাহিনীর এমন সিদ্ধান্ত মূলত তাদের ‘অশিক্ষিত ও নারীবিদ্বেষী’ মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে রয়েছে জান্তার কুখ্যাত ‘ফোর কাটস’ কৌশল। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্রোহীদের খাদ্য, অর্থ, তথ্য এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ–এই চারটি প্রধান রসদ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। গত আগস্ট মাস থেকে বিরোধী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে এই কৌশল কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের সঙ্গে সাগাইংয়ের সংযোগকারী সেতু দিয়ে স্যানিটারি প্যাড পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঋতুস্রাব নিয়ে মিয়ানমারের সমাজে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ট্যাবু বা ছুঁতমার্গ রয়েছে। এই সামাজিক জড়তার সুযোগ নিয়েই সামরিক বাহিনী নীরবে এই নিষেধাজ্ঞা প্রসারিত করেছে। কয়েক বছর আগে মিয়ানমারে ঋতুস্রাববিষয়ক সচেতনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘প্যান কা লে’-এর প্রতিষ্ঠাতা হেনরিয়েট সিরাক মনে করেন, এর পেছনে জান্তার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি খুবই স্পষ্ট যে সামরিক বাহিনী নারীর চলাফেরাকে আরও বেশি সীমিত করতে চায়। এটি সম্পূর্ণভাবে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।’ ঋতুস্রাবের সময় নারীকে ঘরে বন্দি করে রাখলে তারা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রতিরোধ আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাবে–এমনটাই জান্তার হিসাব-নিকাশ বলে মনে করেন অধিকারকর্মীরা।

স্যানিটারি প্যাডের অভাবে মিয়ানমারের নারীরা বাধ্য হয়ে স্বাস্থ্যসম্মত নয়–এমন বিকল্প বেছে নিচ্ছেন। ছেঁড়া ন্যাকড়া, গাছের পাতা বা খবরের কাগজের মতো বিপজ্জনক জিনিস ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এর পরিণতি হচ্ছে ভয়াবহ। নারীরা মূত্রনালির সংক্রমণ, প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

একে তো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, তার ওপর ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পাওয়াও এখন দুঃসাধ্য। থিনজার শুনলেই ই জানান, ইউটিআই সংক্রমণের কারণে নারীর কাছ থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য তারা প্রতিনিয়ত অসংখ্য অনুরোধ পাচ্ছেন। শারীরিক যন্ত্রণায় কাতর নারীরা এ সময় বাধ্য হয়েই নিজেদের ঘরের মধ্যে গুটিয়ে নিচ্ছেন।

পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বা শরণার্থী শিবিরগুলোতে। ২০২১ সালের পর থেকে মিয়ানমারে প্রায় সাড়ে ৩৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেক সংগঠন পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্যাড বিতরণের চেষ্টা করছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে পরিষ্কার পানির তীব্র সংকট থাকায় এগুলো ঠিকমতো ধোয়ার সুযোগ নেই। ফলে অপরিষ্কার প্যাড ব্যবহারে সংক্রমণের হার আরও বাড়ছে।

নিষেধাজ্ঞার ফলে স্যানিটারি প্যাডের একটি বিশাল কালোবাজার তৈরি হয়েছে, যেখানে দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আগে যে প্যাকেট ৩,০০০ কিয়াটে (মিয়ানমারের মুদ্রা) পাওয়া যেত, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯,০০০ কিয়াটে। অথচ মিয়ানমারে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম দৈনিক মজুরি মাত্র ৭,৮০০ কিয়াট। অর্থাৎ একজন নারীর মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি প্যাডের প্যাকেটের দাম তার সারা দিনের আয়ের চেয়েও বেশি!

এ ছাড়া মিয়ানমারের সংস্কৃতিতে মেনস্ট্রুয়াল কাপ বা ট্যাম্পুনের মতো আধুনিক বিকল্পের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। এ ধরনের পণ্য সম্পর্কে তথ্য জানাকেও সামাজিকভাবে খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়। সমাজ নারীদের শিখিয়েছে ঋতুস্রাবের বিষয়টি লুকিয়ে রাখতে, আর এই সামাজিক দুর্বলতাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে সামরিক জান্তা।

একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে তাদের মৌলিক শারীরবৃত্তীয় চাহিদার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা শুধু অমানবিকই নয়, এটি একটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। মিয়ানমারের স্থানীয় মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে এ বিষয়ে জাতিসংঘের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং এই নিষেধাজ্ঞাকে একটি ভয়াবহ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
বিদ্রোহ দমনের নামে নারীর শরীর ও স্বাস্থ্যকে যুদ্ধের ময়দান হিসেবে ব্যবহার করার এই কৌশল প্রমাণ করে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কতটা অমানবিক ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নীরব, অথচ ভয়াবহ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সরব হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
 

আরও পড়ুন

×