মানবিকতায় ঐক্যবদ্ধ
কার্যত জীবনবাজি রেখেই যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর কাজে যুক্ত রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবীরা
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:০৪ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৬:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘মানবিকতায় ঐক্যবদ্ধ’ (ইউনাইটেড ইন হিউম্যানিটি)–এটি ২০২৬ সালের (৮ মে) বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবসের মূল প্রতিপাদ্য। এমন এক সময়ে এই দিনটি উদযাপিত হচ্ছে, যখন বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘মানবিক সহায়তা প্রদান কখনও মৃত্যুর কারণ হতে পারে না, অথচ অনেকের জন্য এটি ক্রমশ তা-ই হয়ে উঠছে।’ জেনেভায় গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতির এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ-আইএফআরসির মুখপাত্র তোমাসো দেল্লা লোঙ্গা।
তিনি ওই সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের ১৩ জন স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মী তাদের মানবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জনই সরাসরি ও নির্মম হামলার শিকার হয়েছেন এবং বাকি চারজন প্রতিকূল পরিবেশে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এর বাইরেও অগণিত কর্মী প্রতিদিন মাঠে কাজ করতে গিয়ে হুমকি ও আঘাতের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিসংখ্যান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপ। দেল্লা লোঙ্গার দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আইএফআরসি নেটওয়ার্কের প্রায় ১০০ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। অথচ এর আগের পাঁচ বছরে (২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত) এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ জনের সামান্য বেশি।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (আইএইচএল) অধীনে ত্রাণকর্মীদের ঐতিহাসিকভাবে যে সুরক্ষা দেওয়া হতো, তা আজ এক ভয়ংকর ও কাঠামোগত বিপর্যয়ের মুখে। বিশ্বজুড়ে মানবিক ও চিকিৎসাকর্মীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার এক নজিরবিহীন ও ক্রমবর্ধমান প্রবণতা লক্ষ্য করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আইএফআরসি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে জানিয়েছে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ত্রাণকর্মীদের মৃত্যুর হার এখন রীতিমতো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় এক হাজার ১০ জনেরও বেশি ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালটি ছিল বিশ্বজুড়ে ত্রাণকর্মীদের জন্য ইতিহাসের ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর’, যে বছর রেকর্ড ৩৩৮ জন মানবতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। আইএফআরসির নিজস্ব নেটওয়ার্কের ভেতরেও ২০২৪ সালে সহিংস ঘটনায় মৃত্যুর হার ৯২ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল।
বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবসের এবারের বার্তায় অত্যন্ত গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মীরা সংকটের মুহূর্তে কোনো বহিরাগত বা ভিনদেশি হিসেবে নয়; বরং সমাজেরই একজন হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ক্রমবর্ধমান জটিল ও বিভক্ত বিশ্বে তারা তাদের সহমর্মিতাকে কাজে রূপ দেন এবং চূড়ান্ত বিপদের মুহূর্তে মানুষের জন্য আশা, মর্যাদা ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
এই সত্যটির সবচেয়ে মর্মান্তিক প্রমাণ হলো বিশ্বজুড়ে নিহত ত্রাণকর্মীর পরিসংখ্যান। এই মৃত্যুর ঝুঁকি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পুরোটাই বহন করতে হচ্ছে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের কর্মীদের। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে যত জন ত্রাণকর্মী নিহত হয়েছেন, তার ৯৯ শতাংশই ছিলেন স্থানীয় কর্মী।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিদেশি কর্মীরা যখন নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজেদের সুরক্ষিত বাংকারে সরিয়ে নেন বা প্রতিবেশী দেশে চলে যান, তখন এই স্থানীয় কর্মীরাই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালান, প্রাথমিক চিকিৎসা দেন এবং খাবার পৌঁছে দেন। অনুদান কমার কারণে স্থানীয় সংস্থাগুলোর কাছে উন্নত বুলেটপ্রুফ গাড়ি বা আধুনিক সুরক্ষা সরঞ্জামও থাকে না। ফলে নিজেদের পাড়ায় বা কাজের এলাকায় তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
শারীরিক হামলার বাইরে বর্তমানে ডিজিটাল তথ্যযুদ্ধ এক নতুন আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আইএফআরসির ‘বিশ্ব দুর্যোগ প্রতিবেদন ২০২৬’ অনুযায়ী, অপতথ্য, ভুল তথ্য এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সরাসরি ত্রাণকর্মীদের জীবনকে বিপন্ন করছে।
সহিংসতার এ ঘটনাগুলো শুধু ত্রাণকর্মীদের জীবনই কেড়ে নিচ্ছে না, এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর। তোমাসো দেল্লা লোঙ্গা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বৃহত্তর এক ভয়াবহ কাঠামোর অংশ। ফলে ত্রাণ সহায়তার পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং অত্যন্ত নাজুক ও দুর্বল জনগোষ্ঠী তাদের জীবন রক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
২০২৪ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২৭৩০ নম্বর প্রস্তাবে ত্রাণকর্মীদের সুরক্ষার কথা বলা হলেও তা আদতে কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। রাষ্ট্রগুলো একদিকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে, অন্যদিকে নিজেরাই ত্রাণবাহী বহরে বোমা ফেলছে। এই প্রচণ্ড হতাশার জায়গা থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১০০টিরও বেশি দেশের সমর্থনে ‘মানবিক কর্মীদের সুরক্ষায় ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়, যেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
এবারের বিশ্ব রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস কেবল মানবতাকর্মীদের অটল প্রতিশ্রুতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলিই নয়; বরং অন্যের সেবায় যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের স্মরণ করার এক শোকাবহ মুহূর্তও। এটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও পক্ষপাতহীন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে সমুন্নত রাখা ও সুরক্ষার এক জোরালো আহ্বান; যাতে করে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে থাকা মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়।
