শৃঙ্খল ভাঙার ৭০ বছর
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে নারী
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০১ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাত দশক আগের কথা। ১৯৫৬ সালের ৯ আগস্ট। বর্ণবাদের কালো থাবায় তখন পিষ্ট দক্ষিণ আফ্রিকা। কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চলাচলের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বৈষম্যমূলক ‘পাস ল’ বা ছাড়পত্র আইন। এর প্রতিবাদে সেদিন প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়ায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সব বর্ণের প্রায় ২০ হাজার নারী। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ‘উইমেন্স মার্চ’-এর ৭০ বছর পূর্ণ হলো ২০২৬ সালের আগস্টে। কিন্তু গ্রেপ্তার, নির্যাতন এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে যে নারীরা সেদিন বর্ণবাদী আইনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, সাত দশক পর আজ তাদের উত্তরসূরিরা বলছেন– লড়াই আজও শেষ হয়নি। বর্ণবাদের শৃঙ্খল হয়তো ভেঙেছে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার নারীদের আজও প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, চরম দারিদ্র্য এবং কাঠামোগত বৈষম্যের মতো দানবদের বিরুদ্ধে।
ফিরে দেখা ১৯৫৬
১৯৫৬ সালের সেই পদযাত্রার সময় রামনি দিনাতের বয়স ছিল মাত্র ১৪। আজ ৮৪ বছর বয়সী এ বৃদ্ধা সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তাঁর মা, বর্ণবাদবিরোধী কর্মী আমা নাইডু কীভাবে সমাবেশের আগে নারীদের সংগঠিত করেছিলেন। সেদিন শুধু কৃষ্ণাঙ্গরাই নয়, নাইডুর মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত এমনকি অনেক শ্বেতাঙ্গ নারীও সেই মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন।
সংবাদ সংস্থা এপিকে দিনাত বলেন, ‘কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা যখন সংগঠিত হচ্ছিল, ভারতীয় নারীরা তখন চুপ করে বসে থাকেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ছিলাম সাধারণ কয়েকজন নারী, যারা বিশ্বাস করতাম আমরা পরিবর্তন আনতে পারি। আমরা কেবল বিশ্বাস করতাম, এটাই সঠিক কাজ।’
জোহানেসবার্গের কেন্দ্রে একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত নারীদের কারাগারটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার অন্যতম হাতিয়ার। আজ সেটি জাদুঘর। কনস্টিটিউশনাল কোর্টের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এ ভবনটি নিপীড়ন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের এক নীরব সাক্ষী।
১৯৫৬ সালের পদযাত্রার অনেক নেত্রী ও অংশগ্রহণকারীকে এই কারাগারে বন্দি করা হয়েছিল। বর্ণবাদী শাসনের নিয়ম অনুযায়ী সেখানেও নারীদের বর্ণের ভিত্তিতে আলাদা রাখা হতো। এই জাদুঘরটি যে কমপ্লেক্সে অবস্থিত, সেই ‘কনস্টিটিউশন হিল’-এর ভিজিটরস সার্ভিস ম্যানেজার নোলুবাবালো মেমেসে বলেন, ‘এই কারাগারের নকশাই করা হয়েছিল নারীদের মনোবল ভেঙে দিতে, তাদের অপমানিত ও অমানবিকীকরণ করতে।’ তিনি জানান, বন্দি কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের অন্তর্বাস পরার বা ন্যূনতম স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের অনুমতিটুকুও ছিল না।
আজ এই জাদুঘর শুধু নেলসন ম্যান্ডেলার দ্বিতীয় স্ত্রী উইনি মাদিকিজেলা-ম্যান্ডেলা বা আলবার্টিনা সিসুলুর মতো বিখ্যাত বর্ণবাদবিরোধী আইকনদেরই সম্মান জানায় না; বরং সেই হাজারো সাধারণ নারীকেও স্মরণ করে, যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় খুব কমই লেখা হয়েছে। মেমেসে বলেন, ‘আমাদের আজকের স্বাধীনতা এই কারাগারে বন্দি থাকা সেসব নারীর কাঁধের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।’
লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মহামারি
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে। সাংবিধানিকভাবে আজ নারীদের চলাচল, কাজ বা সমাজে অংশগ্রহণে কোনো বাধা নেই। কিন্তু মেমেসের মতে, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা আজও তাদের স্বাধীনতার অধিকার খর্ব করে চলেছে।
মেমেসে আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভিন্ন এক দানব আজ আমাদের চলাচলের স্বাধীনতা এবং অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করছে। সেটি হলো লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও অপরাধ। আপনি যদি সকাল ৬টায় একটু জগিং করতে বের হতে চান এবং বাইরে যদি কিছুটা অন্ধকার থাকে, তবে আপনি ভয়ে বের হবেন না।’
জাতিসংঘের ২০১৪ সালের এক গবেষণা বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি তিনজনের মধ্যে অন্তত একজন নারী তাঁর জীবদ্দশায় শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হন। খোদ জাতিসংঘ দেশটির নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর এই মাত্রার সহিংসতাকে ‘সংকট’ এবং ‘জাতীয় ক্ষত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
প্রতিবছর দক্ষিণ আফ্রিকা পরিবার ও দেশ গঠনে নারীদের অবদানের কথা স্মরণ করে ৯ আগস্ট ‘নারী দিবস’ পালন করে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এ প্রশংসাবাক্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। সাম্প্রতিক অপরাধ পরিসংখ্যান এ সংকটের ভয়াবহতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ– এ তিন মাসেই দক্ষিণ আফ্রিকায় ৯ হাজার ৭৮২টি ধর্ষণের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যে ৪ হাজার ৬২০টি (৪৭.২ শতাংশ) ধর্ষণের ঘটনাই ঘটেছে ভুক্তভোগী বা অপরাধীর নিজের বাড়িতে। অর্থাৎ যে বাড়িটিকে সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত আশ্রয় মনে করা হয়, সেখানেই নারীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। এসব পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়; এগুলো সেসব নারীর প্রতিনিধিত্ব করে যাদের জীবন চিরতরে বদলে গেছে। সেসব পরিবারের কথা বলে যারা ট্রমার শিকার এবং সেসব সম্প্রদায়ের চিত্র তুলে ধরে যারা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ধ্বংসাত্মক প্রভাব মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বৈষম্যের ঘেরাটোপ
সরকারি তথ্যমতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেকার হওয়ার হার বেশি। পরিবারে পারিশ্রমিকহীন সেবামূলক কাজের বোঝাও তাদের কাঁধেই বেশি চাপে আর শীর্ষ নেতৃত্বের পদে তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনও হতাশাজনক।
বৈষম্যের এই চিত্র খেলাধুলাতেও স্পষ্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার সফলতম প্যারা-অ্যাথলেট এবং ২০২৪ সালের উইম্বলডন হুইলচেয়ার ডাবলসের শিরোপাজয়ী ৪০ বছর বয়সী টেনিস তারকা কগোথাতসো মন্টজানে বলেন, ‘টেনিসের মতো খেলায় আমাকে যে বাধাগুলো পার হতে হয়েছে, তার মূল কারণ ছিল অর্থ। তারা মিথ্যা বলে না যখন বলে টেনিস হলো শ্বেতাঙ্গদের খেলা। আপনি সত্যিই এই খেলায় কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্য বর্ণের মানুষদের আধিপত্য দেখতে পাবেন না।’
তবুও মন্টজানে বিশ্বাস করেন, ১৯৫৬ সালের সেই নারীরা তার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজ আমি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান নারী হিসেবে চারটি প্রধান টেনিস টুর্নামেন্টেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। এর মূল ভিত্তি ১৯৫৬ সালের নারীরাই তৈরি করে দিয়েছিলেন।’
দক্ষিণ আফ্রিকা যখন পুরোনো সেই বর্ণবাদী নারী কারাগারটি ভেঙে ফেলে, তখন সেখানকার পুরোনো ইটগুলো দিয়েই নতুন জাদুঘরটি তৈরি করা হয়। বিষয়টি মেমেসেকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতের ইট ব্যবহার করেই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছি। আমরা যদি অতীত ভুলে যাই, তবে খুব সহজেই একই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করব।’
১৯৫৬ সালের পদযাত্রার জীবিত সাক্ষীদের একজন, রামনি দিনাতের কাছে গত ৭০ বছরেও এই লড়াইয়ের মূল শিক্ষাটি বদলায়নি। আজকের প্রজন্ম এবং তাদের সামনে থাকা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও বৈষম্যের পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব সংগ্রাম থাকে আর প্রতিটি প্রজন্মকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়– তারা ন্যায়ের পক্ষে উঠে দাঁড়াবে কিনা।’
- বিষয় :
- নারী
- শাহেরীন আরাফাত
- দক্ষিণ আফ্রিকা