ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গর্ভধারণ, চাকরি ও নারী

গর্ভধারণ, চাকরি ও নারী
×

ছবি:: ব্র্যাকের সৌজন্যে

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

গর্ভধারণ মানবজীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও অলৌকিক এক অভিজ্ঞতা। একজন নারীর ভেতর নতুন একটি প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠার এ সফরটি যেমন আনন্দের, তেমনি শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের এক গভীর চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তিজীবনের বন্ধন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্রের আঙিনা–সবখানেই এ সময় একজন অন্তঃসত্ত্বা মা পরম মমতা, সুরক্ষা ও সহমর্মিতা পাওয়ার দাবি রাখেন। তাঁকে মানসিকভাবে স্বস্তিতে রাখা, তাঁর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের যৌথ নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের পেশাগত জীবনের বাস্তবতা কি সেই মানবিকতার কথা বলে?

প্রতিষ্ঠানভেদে চিত্রটি রূপ নেয় প্রচণ্ড নির্মমতায়। অনেক নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই বদলে যায় কর্মস্থলের চেনা পরিবেশ। যে হাতে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব সামলানো হচ্ছিল, সেই হাতগুলোকেই রাতারাতি বিবেচনা করা হয় ‘প্রতিষ্ঠানের বোঝা’ হিসেবে। অবমূল্যায়ন, মানসিক নির্যাতন, জুনিয়রদের সামনে অপদস্থ করা, পদত্যাগের অদৃশ্য চাপ– এমনকি শেষ পর্যন্ত চাকরিচ্যুত করার মতো ঘটনা অহরহই ঘটছে। অথচ মাতৃত্ব কোনো দুর্বলতা নয়; এটি একজন নারীর প্রাক-প্রাকৃতিক অবদান এবং সংবিধান ও আইন দ্বারা স্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

জোশিতা সানজানা রিজভান এবং মাহবুবা দিলশাদ ডেইজির ট্র্যাজিক অভিজ্ঞতা আমাদের করপোরেট কাঠামোর সেই অন্ধকার দিকটিই উন্মোচন করে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি বহুজাতিক অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন জোশিতা সানজানা রিজভান। নিয়োগের প্রথম দিনেই তাঁকে বেশ কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল– তিনি বিবাহিত কিনা, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কিনা। চাকরির শুরুতে তাঁর কাজের প্রশংসা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার নানা পরামর্শ দিয়ে কৃত্রিম এক সহানুভূতি দেখায় কর্তৃপক্ষ।

একই বছরের ডিসেম্বরে জোশিতা গর্ভধারণ করেন। শারীরিক জটিলতার আশঙ্কায় শুরুতে বিষয়টি গোপন রাখলেও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তীব্র ‘ভার্টিগো’ ও রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে  ই-মেইলের মাধ্যমে অফিসকে নিজের গর্ভাবস্থার কথা জানান তিনি। জোশিতার অভিযোগ, গর্ভাবস্থার কথা জানার পর থেকেই কর্তৃপক্ষের আচরণ ১৮০ ডিগ্রি বদলে যায়। কারণে-অকারণে তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, কনিষ্ঠ সহকর্মীদের সামনে অপমানিত করা এবং কাজের সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন বন্ধ করে দেওয়া দৈনন্দিন রুটিনে পরিণত হয়। উচ্চপদস্থ বস ফোনের ওপার থেকে চিৎকার করে মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।

মার্চ মাসে তাঁকে জোরপূর্বক মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করতে বাধ্য করা হয়। এরপর কোম্পানির আইনজীবীকে হাজির করে এক বৈঠকে জানিয়ে দেওয়া হয়–প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে রয়েছে, তাই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। জোশিতা অসম্মতি জানালে তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়, এমনকি হুমকিও দেওয়া হয়। অপমান ও ভীতিকর পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে ল্যাপটপসহ প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক জিনিসপত্র অফিসে রেখে বেরিয়ে আসেন জোশিতা এবং আইনি সুরক্ষার জন্য থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। বিড়ম্বনার এখানেই শেষ নয়। কোম্পানি উল্টো তাঁর বিরুদ্ধে চুরি ও অপপ্রচারের অভিযোগে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। ২০২৫ সালের জুনে যখন তিনি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন তাঁকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানো হয় এবং সারারাত থানায় আটকে রাখা হয়।

এই প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মাশুল দিতে হয় তাঁর গর্ভস্থ সন্তানকে। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই মাত্র ৩৫ সপ্তাহে জন্ম নেয় তাঁর শিশু। নবজাতককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) রেখে জীবন-মৃত্যুর লড়াই চালাতে হয়। আজ সন্তানের বয়স এক বছর পেরিয়ে গেলেও আইনি বেড়াজাল থেকে মুক্তি মেলেনি জোশিতার; অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে তাঁকে এখনও আদালতের বারান্দায় হাজিরা দিতে হচ্ছে। বকেয়া বেতন ও বোনাস বাবদ পাওনা প্রায় ৩২ লাখ টাকা এখনও মেলেনি। পরবর্তী সময়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেও অসুস্থ সন্তানের নিয়মিত চিকিৎসার জন্য বারবার ছুটি নিতে গিয়ে সেই চাকরিটিও তাঁকে হারাতে হয়।

বাংলাদেশের আইটি খাতে দীর্ঘ ১৫ বছরের সুনাম কুড়ানো অভিজ্ঞ পেশাজীবী মাহবুবা দিলশাদ ডেইজি। এর আগে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ডেল’-এ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশীয় একটি বড় আইটি গ্রুপে উচ্চপদে যোগ দেন তিনি। এর কিছু দিন পর ডেইজি জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী। আইটি খাতের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবেশন পিরিয়ড দীর্ঘায়িত হওয়ার ভয়ে তিনি শুরুতে বিষয়টি জানাননি। পরে যখন নিজ থেকে রিপোর্টিং বসকে বিষয়টি জানান, বস তাঁর অনুমতি ছাড়াই তা সিইও-কে অবহিত করেন। একটি অল-টিম মিটিংয়ে সিইও প্রকাশ্যে তাঁকে অভিনন্দন জানান; যা তাঁকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে।

এরপরই শুরু হয় কৌশলগত বর্জন। সিইওর নির্দেশ আসে–‘এ অবস্থায় তাঁর দৌড়ঝাঁপ না করে বিশ্রাম নেওয়া উচিত।’ আপাতদৃষ্টিতে এটি সহমর্মিতা মনে হলেও, ডেইজি দ্রুতই বুঝতে পারেন এটি আসলে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল।

ডেইজি প্রথম সন্তানের সময়ে প্রসবের আগের দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এবারও চিকিৎসকের সনদ নিয়ে দ্বিগুণ উদ্যমে কাজে নামেন। নিজেকে ‘সক্ষম’ প্রমাণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম, মতিঝিলের যানজট ঠেলে ক্লায়েন্ট মিটিং, এমনকি শারীরিক দুর্বলতা গোপন রাখতে নিজের চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পর্যন্ত বাতিল করেন। এর বিপরীতে মাতৃত্বের ৩৪তম সপ্তাহে এসে তাঁকে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই চাকরি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। বাহ্যিকভাবে ‘ব্যবসায়িক সংকট’ বলা হলেও মূল কারণ ছিল তাঁর গর্ভাবস্থা।

মানসিক আঘাতে ডেইজির শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। গর্ভস্থ শিশুর জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসকরা দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। যখন তিনি হাসপাতালের বেডে ছটফট করছেন, তখন জানতে পারেন–তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ও সব ধরনের এক্সেস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেলেনি পাওনা তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটিও। সন্তান জন্মের পর বকেয়া পাওনার জন্য অফিসে গেলে তিনি দেখেন, নতুন সিইও এসেছেন। অফিসে রটিয়ে দেওয়া হয়েছে–তিনি নাকি গর্ভাবস্থা ‘গোপন’ করে চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রতারণা করেছেন!

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কী বলে
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মাতৃত্ব সুরক্ষা কনভেনশন (নং ১৮৩) এবং জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদে স্পষ্ট বলা আছে–গর্ভাবস্থা বা মাতৃত্বের কারণে কোনো নারী কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা যাবে না, কোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে না এবং তাঁর আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আইএলওর নীতি অনুযায়ী, প্রসূতি কল্যাণ কেবল সুযোগ-সুবিধা নয়, বরং নারীর কর্মসংস্থানের স্থায়িত্বের গ্যারান্টি। অথচ আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিশেষ করে বেসরকারি খাত ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে প্রসূতি নারীদের ওপর এই ‘মাতৃত্বের জরিমানা’ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে অহরহ।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত বলেন, ‘গর্ভাবস্থা কোনো নারীর পেশাগত অযোগ্যতা হতে পারে না। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে স্পষ্টত আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিরসনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর (সংশোধিত) ৪৫ থেকে ৫০ ধারায় গর্ভবতী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি (১৬ সপ্তাহ) ও পূর্ণ বেতনসহ সুবিধাদি নিশ্চিত করা হয়েছে। গর্ভাবস্থাকে অজুহাত করে চাকরিচ্যুত করা বা পদ অবনতি ঘটানো সম্পূর্ণ বেআইনি। সরাসরি বরখাস্ত না করে কাজের অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, অকথ্য আচরণ করা বা পদত্যাগে বাধ্য করাও এক ধরনের অপরাধ।’

তিনি আরও পরামর্শ দেন, ভুক্তভোগী নারীদের উচিত নিয়োগপত্র, ই-মেইল, মেডিকেলের কাগজপত্র ও হয়রানির প্রমাণাদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং প্রতিকারের জন্য শ্রম আদালতে মামলা দায়ের করা। আদালত বকেয়া সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন।

নারীপক্ষের সদস্য ও আইনজীবী কামরুন নাহার জোর দিয়ে বলেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়া নারীর এক প্রাকৃতিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের কারণে কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা বা বৈষম্যের শিকার হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের কথা বলে আমরা একদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির কথা বলব, অন্যদিকে প্রসূতি মাকে চাকরি থেকে বিতাড়িত করব–এই দ্বিমুখী নীতি বন্ধ হতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সর্বস্তরে প্রতিরোধমূলক নীতিমালা ও তদারকি জোরদার করা আবশ্যক।’

অন্তঃসত্ত্বা নারী কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা কেবল একজন ব্যক্তির প্রতি অন্যায় নয়; এটি পুরো সমাজের নীতি-নৈতিকতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুঝতে হবে–মাতৃত্ব কোনো ‘সাময়িক অদক্ষতা’ নয়, এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ।

আইনের কঠোর প্রয়োগ, সরকারি তদারকি এবং বেসরকারি খাতে সুস্পষ্ট ‘ম্যাটারনিটি অ্যান্ড কেয়ার পলিসি’ বাস্তবায়ন ছাড়া এই মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। নারীর ক্ষমতায়ন কেবল কর্মক্ষেত্রে যোগদানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, মাতৃত্বের মতো সংবেদনশীল সময়ে তাঁকে সম্মান ও সুরক্ষাসহ টিকিয়ে রাখাই হোক আমাদের আধুনিক সভ্যতার আসল পরিচয়। 

আরও পড়ুন

×