ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বইয়ের ভারে নুইয়ে পড়া শৈশব

বইয়ের ভারে নুইয়ে পড়া শৈশব
×

ছবি :: ইউনিসেফ

আহাদ আদনান

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৬ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রবাদে আছে, ‘কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাসঠাস’। অর্থাৎ কচি অবস্থায় বাঁশকে যেদিকে খুশি বাঁকানো যায়। একবার পেকে গেলে বা শক্ত হয়ে গেলে তাকে আর সোজা করা যায় না। জোর করতে গেলে তা ভেঙে যায়। মানবদেহের মেরুদণ্ড, বিশেষ করে শিশুদের কচি ও বিকাশমান মেরুদণ্ডের সঙ্গে এই বাঁশের দারুণ এক সাযুজ্য রয়েছে। শিশুদের মেরুদণ্ডের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রসারণ ক্ষমতা বড়দের তুলনায় অনেক বেশি। এই নরম ও সংবেদনশীল মেরুদণ্ডের ওপর যদি দিনের পর দিন বই-খাতার অতিরিক্ত ওজনের পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তার চূড়ান্ত পরিণতি কী হতে পারে–তা কি আমরা ভেবে দেখেছি?

ইদানীং শিশু বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে মেরুদণ্ড, ঘাড় বা পিঠের তীব্র ব্যথা নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তাদের প্রায় সবাই স্কুলপড়ুয়া এবং এই যন্ত্রণার পেছনের প্রধান খলনায়ক হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠছে ‘অতিরিক্ত ভারী স্কুলব্যাগ’-এর দিকে। যদিও গবেষণার অভাবে কেবল ব্যাগের ওজনের ওপর এককভাবে দায় চাপানো কঠিন, তবে বৈশ্বিক মানদণ্ড আমাদের একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেয়।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, একটি শিশুর স্কুলব্যাগের ওজন কোনোভাবেই তার নিজের শরীরের ওজনের ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। অর্থাৎ একটি শিশুর ওজন যদি ২০ কেজি হয়, তবে তার ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন হতে পারবে ২ থেকে ৩ কেজি। আপনার ঘরে যদি স্কুলগামী সন্তান থাকে, তবে আজই ওজন মাপার যন্ত্রে তার ব্যাগটি মেপে দেখুন–বাস্তবতা আপনাকে চমকে দিতে পারে।

তবে ব্যাগের ওজনের এই সমীকরণটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় ব্যাগে টিফিনভর্তি বক্স ও পানিতে পূর্ণ বোতল থাকে, যা ফেরার সময় খালি হয়ে যায়। আবার সপ্তাহের প্রতিটি দিন রুটিন অনুযায়ী বই-খাতার সংখ্যাও এক থাকে না।

এর বাইরেও রয়েছে পারিপার্শ্বিক অবস্থা। যে শিশুটি ব্যক্তিগত গাড়িতে চেপে ঠিক স্কুলগেটে নেমে নিচতলার ক্লাসরুমে ঢুকে যায়, তার শারীরিক ধকলের সঙ্গে সেই শিশুটির তুলনা চলে না; যাকে ভারী ব্যাগ পিঠে নিয়ে কয়েকশ মিটার হাঁটতে হয় কিংবা প্রতিদিন উঁচু ভবনের কয়েক তলা সিঁড়ি ভেঙে ক্লাসে পৌঁছাতে হয়। পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর নিজস্ব ওজন, পেশির শক্তি, পুষ্টিহীনতা বা পূর্ববর্তী কোনো রোগের ইতিহাসও এসব ক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এই প্রতিটি বিষয়ই শিশু স্বাস্থ্য গবেষণায় একেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে ধারণক্ষমতার চেয়ে ভারী ব্যাগ বহন করলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বেশ কিছু গুরুতর প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়:
১. পেশি ও স্নায়ুর ওপর চাপ: পিঠ, ঘাড়, কাঁধ ও হাতে তীব্র ব্যথা শুরু হয়, যা বয়ঃসন্ধিকালে বা পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদি কোমর ব্যথায় রূপ নিতে পারে। 
২. কঙ্কালতন্ত্রের বিকৃতি: অতিরিক্ত ভার সামলাতে গিয়ে শিশুরা সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটে। এর ফলে মেরুদণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে যেতে পারে। দূর থেকে বোঝা যায়, শিশুটি কুঁজো হয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাদের স্বাভাবিক উচ্চতা বাড়ার ওপর। 
৩. কর্মক্ষমতা হ্রাস: ভারী ব্যাগের প্রভাবে ফুসফুসের প্রসারণ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। ফলে এই শিশুরা বড় হলে দ্রুত দৌড়াতে বা পা ফেলে হাঁটতে পারে না এবং অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে। 
৪. মানসিক অবসাদ: ভারী ব্যাগ নিয়ে দীর্ঘপথ হাঁটা বা সিঁড়ি ভাঙার ফলে শিশুরা স্কুলে গিয়েই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ তাদের শেখার আগ্রহ কমিয়ে দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরীক্ষার ফলে।

বাংলাদেশে শিশুদের স্কুলব্যাগের ওজন নিয়ে ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিলেন। সেই রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের স্কুলব্যাগের ওজন কোনোভাবেই শিশুর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এই নির্দেশনার আলোকে আইন প্রণয়ন ও পরিপত্র জারি হলেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও তদারকি আজও প্রশ্নবিদ্ধ।

নীতিগত জায়গা থেকে সরকার এবং স্কুল কর্তৃপক্ষকে এখনই কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে–
* রুটিন অনুযায়ী বই-খাতার সংখ্যা কঠোরভাবে সীমিত রাখা।
* ডিজিটাল ক্লাসরুম বা ই-বুক ব্যবহারের পরিধি বাড়ানো।
* স্কুলে বই-খাতা রাখার জন্য লকার বা নির্দিষ্ট শেলফের ব্যবস্থা করা।
* স্কুল প্রাঙ্গণেই স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ খাবার পানি এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা, যাতে শিশুকে বাড়ি থেকে অতিরিক্ত পানির বোতল বা ভারী টিফিন বক্স বইতে না হয়। 

লেখক: শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×