খসড়া বিধিমালায় আটকে আছে রিট ফান্ড
.
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১১
বাংলাদেশে পুঁজিবাজার বা বিনিয়োগের জগতে রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট বা ‘রিট’ ফান্ড এখনও অপরিচিত। অথচ বিশ্বের বহু দেশেই এই বিনিয়োগপণ্য শহুরে উন্নয়ন, আবাসন শিল্পের টেকসই অর্থায়ন এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের উদ্ভাবনী ও জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রিট ফান্ড চালুর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বিধিমালার খসড়া প্রকাশ করে। এখনও তা চূড়ান্ত হয়নি। ফলে বিনিয়োগের নতুন এ ক্ষেত্র এখনও পরিকল্পনায় আটকে আছে।
রিট ফান্ড কী?
রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিট) ফান্ড হলো এক ধরনের বিনিয়োগপণ্য। এটি মূলত ট্রাস্ট কোম্পানির অধীনে বিভিন্ন ধরনের সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করে এবং সেখান
থেকে অর্জিত আয়ের (ভাড়া, সম্পত্তি বিক্রির মুনাফা ইত্যাদি) নির্দিষ্ট একটি অংশ নিয়মিতভাবে বিনিয়োগকারীদের মাঝে লভ্যাংশ হিসেবে বিতরণ করে।
রিটের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় বড় আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, শপিং মল, অফিস টাওয়ার, হাসপাতাল, হোটেল বা এমনকি ওয়্যারহাউসের মালিকানায় অংশ নিতে পারেন। এটি অনেকটা শেয়ারবাজারে শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করার মতো। রিট থেকে সরকারি বড় অবকাঠামো প্রকল্পেও বিনিয়োগ হতে পারে।
ধরুন, একটি আবাসন প্রকল্পে ফ্ল্যাট বা একটি বাণিজ্যিক ভবনের ফ্লোর স্পেস কেনার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য আপনার নেই। কিন্তু আপনি জানেন– ওই ফ্ল্যাট বা ফ্লোর স্পেস ভাড়া দিয়ে ভালো অঙ্কের টাকা পাওয়া সম্ভব। রিট হলো এমন একটি সম্মিলিত বিনিয়োগ স্কিম, যা বহু মানুষের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে ওই ফ্ল্যাট বা ফ্লোর স্পেস কিনে নেয়, অথবা দীর্ঘ মেয়াদে লিজ নিয়ে পরে ভাড়া দিয়ে অর্থ আয় করার সুযোগে করে দেয়। চাইলে বিক্রিও করে দিতে পারে। ভাড়া বা বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের ৯০ শতাংশই রিটের ইউনিটধারীদের কাছে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হয়।
এটি অনেকটা মিউচুয়াল ফান্ডের মতো, তবে মিউচুয়াল ফান্ডের থেকে অর্জিত মুনাফা বণ্টনের হার বেশি। রিট মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মতো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। ফলে একজন বিনিয়োগকারী চাইলে নিজের অংশ বিক্রি করে দিতে পারেন, আগ্রহী অন্যের কারও কাছে।
রিট ফান্ড কে বা কারা চালায়
রিট ফান্ড গঠন এবং এর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখার জন্য একটি ট্রাস্টি থাকে, যা ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত হতে হয়। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপনার জন্য যেমন সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানি থাকতে হয়, রিট পরিচালনার জন্য রিট ম্যানেজার থাকে। রিট ম্যানেজার হতে নিবন্ধন নিতে হয়। বাংলাদেশে এ নিবন্ধন দেওয়ার অধিকারী হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। রিট ম্যানেজারের নিজস্ব অন্তত ২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব করা আছে খসড়া রিট বিধিমালায়। রিট ফান্ড থেকে কোনো সম্পদ লিজ অথবা ভাড়া অথবা কেনা হলে তা তত্ত্বাবধান করার জন্য প্রপার্টি ম্যানেজার রাখারও বিধান আছে। এ জন্য রিট ম্যানেজার এবং প্রপার্টি ম্যানেজার বছর শেষে সংশ্লিষ্ট রিট ফান্ডের যথাক্রমে সর্বোচ্চ এক শতাংশ এবং আধা শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ ফি হিসেবে নিতে পারে।
রিট ফান্ড গঠনের জন্য মিউচুয়াল ফান্ডের মতো এক বা একাধিক বড় বিনিয়োগকারী (সাধারণত প্রতিষ্ঠান) উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগ করে। চাইলে রিট ম্যানেজারের উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগ করার সুযোগ আছে। বিএসইসির খসড়া রিট বিধিমালায় একটি রিটের আকার কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় হলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার আকার হওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাকে সংশ্লিষ্ট রিট ফান্ডের অন্তত ২০ শতাংশ প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ করতে হবে, যা কোনো সময় ১০ শতাংশের নিচে নামতে পারবে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রিটের ব্যবহার
রিটের প্রথম প্রচলন হয় ১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। রিটগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত থাকে এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীরা খুব সহজেই এগুলোর কেনাবেচা করতে পারেন। আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ রিট কোম্পানি সিমন প্রপার্টি গ্রুপ, যা শপিং মল এবং প্রিমিয়াম আউটলেটসের মালিক।
সিঙ্গাপুরকে বলা হয় এশিয়ার রিট হাব। সেখানে প্রায় ৫০টির বেশি তালিকাভুক্ত রিট রয়েছে, যা এ দেশের মোট স্টক মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের প্রায় ১২ শতাংশ। রিটের মাধ্যমে দেশটির আবাসন ও বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগও এসেছে।
প্রতিবেশী ভারতের শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি ২০১৪ সালে রিট চালুর গাইডলাইন দেয় এবং ২০১৯ সালে প্রথম রিট– এমবাসি অফিস পার্কস– বাজারে আসে। বর্তমানে কয়েকটি রিট তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং এগুলোর মাধ্যমে করপোরেট অফিস স্পেসে সাধারণ মানুষও বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।
ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনেও রিট ব্যবহৃত হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন, হোটেল, হাসপাতাল এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থায়নে। অনেক সময় সরকার নিজেই রিট গঠন করে অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করে থাকে।
বাংলাদেশে চালুর প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে মধ্য ও নিম্নবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন একটি সমস্যা। অন্যদিকে
রিয়েল এস্টেট খাত ক্রমে বড় হচ্ছে। এ খাতের জন্য যথেষ্ট অর্থায়ন ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, বেসরকারি নির্মাণ ও আবাসন খাতে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়; যার বেশির ভাগ ব্যাংক ঋণনির্ভর। একদিকে এই ঋণ খরচ বহন করা কঠিন, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণও। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে অনেক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্ব হয়।
রিট চালু হলে আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা মূলধন সংগ্রহ করতে পারবেন পুঁজিবাজার থেকে। সাধারণ মানুষ খুব অল্প পুঁজি নিয়ে রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, অর্থনীতির ঝুঁকি কমবে। নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন সহজ হবে।
করনীতি ও বিনিয়োগ-উৎসাহ
বিশ্বজুড়ে রিটকে কর-সুবিধা দেওয়া হয়, যেমন– রিট কোম্পানি যদি অন্তত ৯০ শতাংশ আয়ের লভ্যাংশ হিসেবে দেয়, তাহলে কোম্পানির আয়কর মওকুফ করা হয়। এতে কোম্পানিগুলো আরও বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হয় এবং বিনিয়োগকারীরাও বেশি লভ্যাংশ পান বলে বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
বাংলাদেশেও রিট চালু করতে হলে করনীতি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, সম্পত্তি নিবন্ধন সহজীকরণ এবং ফিন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজার ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
রিট কোনো জাদু নয়–এটি একটি কাঠামোবদ্ধ, আইনানুগ ও স্বচ্ছ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া, যা রিয়েল এস্টেট খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে নিয়ে আসে। বাংলাদেশ যদি রিট ফান্ড চালু করতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন
আবাসন খাতে নতুন মূলধনের স্রোত তৈরি হবে, অন্যদিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীও স্থায়ী আয়ভিত্তিক সম্পদে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিনির্ধারকদের সাহসী পদক্ষেপ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
- বিষয় :
- তহবিল ছাড়
