বিএসটিআইর ল্যাবরেটরি চালু
মান যাচাই হবে হেলমেটের
কোলাজ
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০০:১৩
মোটরসাইকেলে যেনতেন হেলমেট দিয়ে যাত্রী ওঠানো কিংবা কলকারখানায় শ্রমিকদের নিম্নমানের হেলমেট দিয়ে কাজ করানোর প্রবণতা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণ ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো হেলমেট ব্যবহার করা যাবে না। সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। সংস্থাটির লোগোযুক্ত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে দেশের সব জেলার এসপি, ডিএমপি, সার্জেন্ট, বিআরটিএ, নৌ-স্থলবন্দরসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে।
উবার ও পাঠাও চালকরা বলছেন, তাদের হেলমেটের ব্যবহার হয় বেশি। মোটামুটি উন্নত মানের একেকটা হেলমেটের দাম পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। প্রায় সময় হেলমেট চুরি হয়ে যায়। এতে রাইডাররা বড় ক্ষতির মুখে পড়েন।
এ ছাড়া ঘন ঘন হেলমেট পরিবর্তন করতে
হয়। তাই বিএসটিআইর এ উদ্যোগ তাদের খরচ বাড়াবে।
দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, জীবনযাত্রার পরিবর্তনসহ নানা কারণে দিন দিন মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি। নির্মাণ, খনি, সামরিক, বিমান চলাচল এবং খেলাধুলার মতো ক্ষেত্রগুলোতেও হেলমেট গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী উভয়ের হেলমেট পরিধানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় হেলমেট জীবনরক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা সরঞ্জাম হিসেবে পরিচিত।
এসব কারণে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে হেলমেটের চাহিদা। বর্তমানে দেশে বার্ষিক হেলমেটের চাহিদা প্রায় তিন লাখ পিস, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৫৮০ কোটি টাকা। দেশে খুব বেশি হেলমেট উৎপাদন হয় না। প্রাণ গ্রুপ কিছু হেলমেট উৎপাদন করে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ফলে চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয়। ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে হেলমেট আমদানি হয়। আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। বাকি ৪০ শতাংশ চীনসহ অন্যান্য দেশ থেকে। ভেগা, এক্সর, অ্যারাই, শোহিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হেলমেট রয়েছে। এমটি, সার্ক, এলএস-২সহ ইউরোপের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হেলমেট চীনে সংযোজন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। দেশে হেলেমেটের প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ।
যেসব হেলমেট আমদানি করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো মানসম্মত হয় না। ব্যবহারকারীকে সুরক্ষা দিতে পারে না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক হাজার ৭০৬ জন মারা গেছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত বছর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন দুই হাজার ৬০৯ জন মানুষ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, চলতি বছরের সর্বশেষ মে মাসে ২৩৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৫৬ জন নিহত, ২০১ জন আহত হয়েছেন।
বিএসটিআইর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব দুর্ঘটনায় অনেকেই আহত ও নিহত হয়েছেন দুর্বল হেলমেট ব্যবহারের কারণে। রাস্তায় লাখ লাখ মোটরসাইকেল দেখা যায়। চালকরা যেসব হেলমেট ব্যবহার করেন, সেগুলো খুবই নিম্নমানের। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব হেলমেট অনেক সময় মোটরসাইকেলচালক কিংবা যাত্রীকে নিরাপত্তা দিতে পারে না। হেলমেট ভেঙে মাথায় আঘাত লেগে যায়। অন্যদিকে নির্মাণ খাতে যেসব শ্রমিক কাজ করেন, তারাও খুবই নিম্নমানের হেলমেট ব্যবহার করেন। ফলে তাদের নিরাপত্তাও ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকে। এসব বিষয় বিবেচনা করে হেলমেটের মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বিএসটিআই। এ জন্য সংস্থাটি তাদের কার্যালয়ে একটি ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে। সেখানে ছয় কোটি থেকে সাত কোটি টাকা খরচ করে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন ওই ল্যাবে গিয়ে দেখা গেছে, হেলমেটের বিভিন্ন অংশ, বিভিন্ন আঙ্গিকে পরীক্ষা করার জন্য সাত-আট ধরনের যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। থরে থরে সাজানো আছে বিভিন্ন পরিমাপের যন্ত্রাংশ। এসব যন্ত্র দিয়েই পরীক্ষা করা হয় হেলমেটের প্রোটেকটিভ প্যাড বা বাইরের অংশ, লাইনার বা ভেতরের অংশ, চিন স্ট্র্যাপ বা হেলমেটকে সুরক্ষিত রাখতে থুতনির নিচে বাঁধা ফিতা ও ভিসার বা হেলমেটের সামনের স্বচ্ছ অংশ ইত্যাদি।
গত ১৪ জুলাই হেলমেট টেস্টিং ল্যাবরেটরি চালু করে বিএসটিআই। এর মাধ্যমে সব ধরনের হেলমেটের মান যাচাই করা হচ্ছে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বিএসটিআইর লোগো সংযুক্ত করা যাবে সংশ্লিষ্ট হেলমেটে। এই লোগোযুক্ত হেলমেটই ব্যবহার করতে হবে মোটরসাইকেল চালানোর সময়। শিল্পকারখানায় কাজ করার সময় শ্রমিকদেরও বিএসটিআইর স্বীকৃত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে।
বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, গত এপ্রিলে এক সপ্তাহ ধরে সারাদেশে হেলমেটের ব্যবহার ও গুরুত্ব সম্পর্কে ক্যাম্পেইন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে ডিসি ও এসপিদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। নিরাপদ হেলমেট ব্যবহারে নিশ্চিত করতে তারা ভূমিকা রাখবে।
আমদানি করা হেলমেটের সিংহভাগ আসে চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে। বিএসটিআই থেকে ওই দুই বন্দরকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিএসটিআইর ছাড়পত্র ছাড়া এখন থেকে কোনো ধরনের হেলমেট খালাস হবে না।
বিএসটিআইর মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম সমকালকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে মানসম্পন্ন হেলমেট যাচাইয়ের নিজস্ব ল্যাব ছিল না। বিশ্বমানের পরীক্ষণ যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এখন থেকে হেলমেটের মান যাচাই করা যাবে। এর মাধ্যমে ভোক্তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে সহায়তা করবে। এ জন্য মানসম্পন্ন হেলমেটকে এখন বিএসটিআইর বাধ্যতামূলক পণ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
হেলমেটের মান যাচাইয়ের ল্যাবটি পরিচালনা করছে বিএসটিআইর পদার্থ পরীক্ষণ উইং। এই উইংয়ের পরিচালক মো. শাহাদৎ হোসেন সমকালকে বলেন, বিশেষ করে মোটরবাইকে রাস্তায় চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি হেলমেট ক্রয়, বিক্রয় এবং ব্যবহারের আগে বিএসটিআইর লোগো এবং কিউআর কোড সংযুক্ত কিনা, তা যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান।
এখন রাস্তায় মোটরবাইকে যেসব হেলমেট ব্যবহার হচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে–এমন প্রশ্নের জবাবে শাহাদৎ হোসেন বলেন, গত জুনে বিভিন্ন মার্কেটে দোকানে দোকানে গিয়ে ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা বিএসটিআইর লোগো ছাড়া হেলমেট বিক্রি না করেন। জনসচেতনতা বাড়াতে এর আগে এই বিষয়ে গণবিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে। তবুও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়েনি। বিএসটিআইর লোগো ছাড়া এখন যেসব হেলমেট ব্যবহার করা হচ্ছে, সার্জেন্টরা সেসব হেলমেট ব্যবহারকারীকে ধরে আইনের আওতায় আনতে পারেন। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এড়াতে ভবিষ্যতে বিএসটিআইও অভিযানে নামবে। সেই প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।
বিএসটিআইর উপপরিচালক (পুরকৌশল) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, এই উদ্যোগ কোনো একটি সংস্থার একক চেষ্টায় বাস্তবায়ন হবে না। রাস্তায় মোটরসাইকেলে নিরাপদ হেলমেট নিশ্চিত করতে হলে সার্জেন্ট ও ট্রাফিককে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যদিকে নির্মাণ খাতে নিরাপদ হেলমেট নিশ্চিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট মালিককেই উদ্যোগ নিতে হবে। বিএসটিআই হেলমেটের মান যাচাই করবে; ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে না।
গত বৃহস্পতিবার নাবিস্কো মোড়ে রাহাত আহমেদ নামে এক পাঠাও চালকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক। ভালো হেলমেট কিনতে গেলে কমপক্ষে তিন হাজার টাকা লাগে। এর চেয়ে অনেক দামি হেলমেটও আছে। এই নিয়ম চালু হলে রাইডারদের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কারণ ক’দিন পরপর হেলমেট চুরি হয়। তা ছাড়া প্রতিদিন ব্যবহারের কারণে কয়েক মাস পরপর হেলমেট বদলাতে হয়।
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ হেলমেট উৎপাদন করে বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল সমকালকে বলেন, ‘সম্প্রতি হেলমেটে বিএসটিআই লোগো ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমরা এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এ উদ্যোগের ফলে দেশে মানহীন হেলমেট বাজারজাত ও বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে।’
গত বছরের শেষ দিকে যৌথ বিনিয়োগে হেলমেট তৈরি করার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান এটলাস বাংলাদেশের সঙ্গে রানার অটোমোবাইলসের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রানা ট্রেড পার্ক লিমিটেডের একটি সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। রানার গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, একটি চুক্তি হয়েছে। তবে এই বছর নয়, আগামী বছরে রানার হেলমেট উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে।
- বিষয় :
- বিএসটিআই
