ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে  ভাতা বাড়ানোর উদ্যোগ
×

.

মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৭ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৯:৫৭

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কিছু ভাতার পরিমাণ ১০ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। এ সময়ে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হলেও এসব ভাতার পরিমাণ বাড়েনি। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আসলে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বছরে অন্তত একবার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউল আবেদীনের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। ক্যাশভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া সুবিধা পদ্ধতিগতভাবে সময়ে সময়ে পর্যালোচনাবিষয়ক এ সভায় ড. জিয়াউল আবেদীন বলেন, ক্যাশভিত্তিক বা নগদ টাকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে প্রদেয় সুবিধা অংশীজন নিয়ে সময়ে সময়ে পর্যালোচনা করা গেলে এর কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে তা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। 

তিনি সভাকে অবহিত করেন, বিভিন্ন সময়ে মূল্যস্ফীতির ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো প্রদেয় ভাতার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে তা পর্যালোচনা করার প্রস্তাব এসেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। তিনি বলেন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি ঋণ কর্মসূচির আওতায় ক্যাশভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পদ্ধতিগতভাবে সময় সময়ে রিভিউ করার একটি শর্ত রয়েছে। 
সভায় অর্থ বিভাগের বাজেট শাখা থেকে এ বিষয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতাভুক্ত মোট কর্মসূচি ৯৫টি। এর মধ্যে ক্যাশভিত্তিক কর্মসূচি রয়েছে ২১টি। পর্যালোচনা করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রধান প্রধান ক্যাশভিত্তিক কার্যক্রমকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো প্রতিবছরে একবার রিভিউয়ের প্রস্তাব করে অর্থ বিভাগ।

অর্থ বিভাগের উপস্থাপনায় বাংলাদেশের ক্যাশভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোতে দেওয়া  সুবিধাকে রিভিউয়ের আওতায় আনার ক্ষেত্রে প্রচলিত তিনটি পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়। প্রথম পদ্ধতি হলো– ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ব্যবহার করে ভাতার হারকে এমনভাবে বাড়ানো, যাতে মূল্যস্ফীতি ভাতার পরিমাণকে প্রভাবিত না করে। দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো, মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আলোকে সামাজিক সুবিধাগুলো পর্যালোচনা করা। তৃতীয় পদ্ধতি হলো, মূল্যস্ফীতি এবং মাথাপিছু আয় বিবেচনায় পর্যালোচনা করা। 

সভায় ক্যাশভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর পর্যালোচনার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে সিপিআইর বৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ পদ্ধতিতে বছরে কমপক্ষে একবার ভাতার হার পর্যালোচনা করা হবে। প্রাথমিকভাবে ছয়টি কর্মসূচিকে এ পদ্ধতিতে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে– সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীগুলোর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম। এ তালিকায় আরও রয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান (ইজিপিপি) কর্মসূচি। 

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বাজেটে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির আওতায় মোট ৬১ লাখ উপকারীভোগী মাসিক ৬৫০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে চার হাজার ৭৯১ কোটি ৩১ লাখ টাকা। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা কার্যক্রমের আওতায় মাসিক ৬৫০ টাকা হারে মোট ২৯ লাখ জন ভাতা পাচ্ছেন। ৩২ লাখ ৩৪ হাজার প্রতিবন্ধী প্রতি মাসে ৯০০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন। এ ছাড়া অনগ্রসর ও বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বেশ কিছু সংখ্যক বিভিন্ন হারে ভাতা পেয়ে আসছেন। 

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো পর্যালোচনার জন্য অর্থ বিভাগের বাজেট-১ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কার্যকরী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এ কমিটির অন্যান্য সদস্য হবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এবং পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর পরিচালক এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের একজন পরিচালক।  প্রয়োজনে আরও সদস্য নেওয়া যাবে। 
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কার্যকরী কমিটি ন্যূনতম একবার ভাতার হার রিভিউ করে এর সুপারিশ-সংবলিত প্রতিবেদন সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির কাছে উপস্থাপনের জন্য অর্থ সচিব বরাবর দাখিল করবে।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। কার্যকরী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সভার সিদ্ধান্তের আলোকে প্রাথমিকভাবে ছয়টি কর্মসূচি রিভিউ করা হলেও পরে অন্যগুলোও এর আওতায় আনা হবে। বর্তমান সরকার শুরু থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সংস্কারে কাজ করছে। তাই এ উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করার তাগাদা রয়েছে। 
জানতে চাইলে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যে পরিমাণ ভাতা দেওয়া হয়, তা দিয়ে উপকারভোগীর তেমন কিছুই হয় না। তারপরও সেটি দরিদ্র মানুষের জন্য অন্তত ওষুধ কেনাসহ অন্যান্য কাজে উপকারে আসে। কিন্তু এটি যদি পাঁচ, সাত কিংবা ১০ বছরে একই থাকে, মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সে অর্থের আর কোনো উপযোগিতা থাকে না। 

তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবী থেকে পেনশনভোগী সবারই বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হয়। এ ক্ষেত্রে সময়ে সময়ে বাড়ানোর জন্য একটি পদ্ধতি বা ব্যবস্থা থাকা উচিত। অর্থ মন্ত্রণালয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যে সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি প্রশংসাযোগ্য। যত দ্রুত সম্ভব এটি বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি। 
প্রসঙ্গত, কয়েক অর্থবছর ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা যাচ্ছে না। গত ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। ওই অর্থবছরে ৯ শতাংশের কিছু বেশি হয় গড় মূল্যস্ফীতি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার সময় বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। তবে বাস্তবতার আলোকে সে লক্ষ্যমাত্রায় সংশোধন আনা হয়। গড় মূল্যস্ফীতির সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৯ শতাংশ। তবে হয়েছে তার চেয়েও অনেক বেশি। গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হয় ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, যা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

এদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি খাতের বরাদ্দের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে শুরু করে পেনশন বাবদ বরাদ্দকেও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ হিসেবে দেখানো হতো। অন্তর্বর্তী সরকার এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সুদকে এ খাত থেকে বাদ দিয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল আট হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ২০২৫-২৬ বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদ বাবদ থাকা অর্থ বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতের মোট বরাদ্দের প্রায় ৪৫ শতাংশ রাখা হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও কৃষি ভর্তুকির জন্য। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদরা অভিযোগ করে আসছিলেন, সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাতেই এর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও এ তিন খাতে বরাদ্দ দেখানো হয়।

সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক ধাক্কায় কর্মসূচির সংখ্যা ৪৫টি কমিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সংখ্যা ১৪০ থেকে কমিয়ে ৯৫-এ নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সামাজিক সুরক্ষার আওতায় তিন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছিল। তবে চলতি বাজেটে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের আওতায় আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এবং খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় মোট ২৭টি কর্মসূচির মাধ্যমে এ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা হয়ে আসছিল। চলতি বাজেটে কিছু অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসূচি বাদ ও একই ধরনের কর্মসূচি একীভূত করে এ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২২টি কর্মসূচি রাখা হয়েছে।  

সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যাপ্তি ও গুরুত্ব বিবেচনায় চলতি অর্থবছরে এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ; মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি দেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত জিডিপির ৫ শতাংশ।

আরও পড়ুন

×