বিশ্ববাজার ধরতে পারছে না সম্ভাবনাময় হস্তশিল্প
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫১ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
হস্তশিল্প উৎপাদনে বিশেষ কোনো কারিগরি বিদ্যার প্রয়োজন হয় না। কাঁচামালও অতি সাধারণ। বাঁশ-বেতের মতো সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপকরণ। এতে স্থানীয় মূল্যসংযোজন প্রায় শতভাগ। অন্যান্য প্রধান রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো নেই দূষণের দায়। এ রকম সুবিধার সুবাদে হস্তশিল্পের বিশ্ববাজার শাসন করার কথা ছিল বাংলাদেশের। সেটি এখনও সম্ভব হয়নি। হস্তশিল্পের বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের হিস্যা টেনেটুনে ১ শতাংশের মতো। অথচ এ খাতের বিশ্ববাজার বাড়ছে ২০ শতাংশ হারে।
হস্তশিল্প মানে হাতে তৈরি শিল্প, যেখানে থাকে না যন্ত্রের যন্ত্রণা। থাকে বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় কিংবা আঞ্চলিক ঐতিহ্য।
ঘর সাজানোর জিনিসপত্র, পোশাক, গহনা, মাটির পাত্রসহ সাধারণ ব্যবহারিক সামগ্রী রয়েছে হস্তশিল্পের তালিকায়। প্রাকৃতিক, প্রক্রিয়াজাত বা পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ ব্যবহার করা হয় হস্তশিল্প তৈরিতে। কাঠ, মাটি, কাপড়, ধাতু, বাঁশ, বেত, পাট এবং চামড়ার মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করা হয়। প্রধান হস্তশিল্প পণ্যের মধ্যে রয়েছে নকশিকাঁথা, মাটির তৈরি পণ্য, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, জামদানি, পাটজাতপণ্য, টেরাকোটা ইত্যাদি।
নিজস্ব কাঁচামাল ও প্রায় শতভাগ মূল্যসংযোজন সুবিধা থাকলেও হস্তশিল্পের রপ্তানি এবং অভ্যন্তরীণ বাজার বড় না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ পণ্যবৈচিত্র্য কম থাকা, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা। বাজারে স্বল্পমূল্যের বিকল্প কাঁচামালের সহজলভ্যতা, বিশ্ববাজারে বিপণন সংযোগের ঘাটতি, ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি। এসব কিছুর পেছনে রয়েছে সরকারি নীতিসহায়তার অভাব। ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প খাতকে একটি সুসংগঠিত, রপ্তানিমুখী ও টেকসই শিল্পে রূপান্তর করতে হলে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবল সংকট, কাঁচামালের খরচ বৃদ্ধি, উৎপাদন অবকাঠামোর ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিং দুর্বলতার মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোকে কাটিয়ে ওঠার কথা বলছেন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি বছরে ৩-৪ কোটি ডলার
হস্তশিল্পের বিশ্ববাজার বরাবরের মতো চীন ও ভারতের দখলে। বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া। এই দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১তম। ইউরোপ, আমেরিকাসহ প্রায় সব বাজারেই রপ্তানি হয় বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প পণ্য। বাংলাদেশ থেকে হস্তশিল্পজাত পণ্য যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, স্পেন, জাপানসহ বিশ্বের ৫০ দেশে যায়। কভিড অতিমারির কারণে প্রাকৃতিক পণ্য ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ায় বাংলাদেশি হস্তশিল্পের জন্য সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে রপ্তানির ৬০ শতাংশ হচ্ছে ইউরোপে। হস্তশিল্পের বৈশ্বিক বাজার প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে হস্তশিল্পের বিশ্ববাজারের আকার হবে প্রায় আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারের।
বিশাল এ বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ১ শতাংশেরও কম। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতের রপ্তানি আয় ছিল এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ৪ কোটি ২৮ লাখ ডলার। এর আগের বছরগুলোতে দুই থেকে আড়াই কোটি ডলারের মধ্যে সীমিত ছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য-উপাত্ত বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে এ খাতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ কম। ওই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের কিছু বেশি। বাংলাদেশি হস্তশিল্প পণ্যের প্রধান ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।
স্থানীয় বাজার ১৫ হাজার কোটি টাকার
এক হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে হস্তশিল্পের স্থানীয় বাজারের বার্ষিক আকার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুসারে, দেশে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ হস্তশিল্প শিল্পের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী। মোট কর্মীর মধ্যে ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারভিত্তিক কারখানা এবং ৪ দশমিক ২ শতাংশ পৃথক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, হস্তশিল্প তাদের প্রধান পেশা। বাকি ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ বলেছেন, এটি তাদের আয়ের দ্বিতীয় উৎস।
চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেসব
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে দেশের হস্তশিল্পের বিকাশ এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে বেশ কিছু সমস্যার কথা জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে–সরকারি নীতিসহায়তার অভাব, বিশ্ববাজারে বিপণন সংযোগের ঘাটতি, ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব, বাজারে স্বল্পমূল্যের বিকল্প পণ্য, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ হ্যান্ডিক্রাফ্টসার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এবং নিপুণ ক্রাফটসের চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমান সমকালকে বলেন, হস্তশিল্পে অনেক সম্ভাবনা ছিল। সরকারের মনোযোগের অভাবে কোনো সম্ভাবনাই কাজে আসেনি। নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ থেকে কমে ৬ শতাংশে নেমেছে। আগামীতে হয়তো তাও থাকবে না। তবে মূল সমস্যা হচ্ছে–পণ্যের বৈচিত্র্য ও মানে ঘাটতি।
যে ধারায় শুরু হয়েছিল এখনও সেখানে খুব বেশি উন্নতি আসেনি। বাজারে হস্তশিল্পের কোনো কোনো পণ্যের বিকল্প পণ্য হিসেবে প্লাস্টিকের বিশ্ববাজারের উপযোগী করে পণ্য উন্নয়নে ডিজাইনে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সেটি হয়নি। কিছু কিছু মানসম্পন্ন পণ্যও নীতিসহায়তার অভাবে আর টিকতে পারেনি।
নিজের কারখানার অভিজ্ঞতা বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সাভারে তাঁর কারখানা থেকে দৃষ্টিনন্দন এবং আরামদায়ক কুইল্ট বা লেপ তিনি আমেরিকায় রপ্তানি করতেন। তবে উচ্চ সুদের ঋণ এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আর টিকতে পারেননি তিনি। গত আট বছর ধরে তাঁর কারখানাটি বন্ধ রয়েছে।
এরকম অভিজ্ঞতা অনেক উদ্যোক্তার। পণ্যের মান উন্নয়নে বিদেশি বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়া, সব পর্যায়ে নীতিসহায়তা, সুদের হার সহনীয় করা, বিপণনে সহায়তার মতো বিষয়গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম দেশের হস্তশিল্প খাত।
মূলধন সংকট ৮২ শতাংশ উদ্যোক্তার
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৮২ শতাংশেরও বেশি হস্তশিল্প উদ্যোক্তা মূলধন সংকটে ভুগছেন। তারা ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। স্থানীয় হস্তশিল্প শিল্পগুলোর বেশির ভাগ পরিবারভিত্তিক হলেও একটি অংশের আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে। যাদের আলাদা প্রতিষ্ঠান আছে তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশ মূলধন সংকটে পড়েছে।
হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২২ থেকে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশের ৭ হাজার ৩১০টি হস্তশিল্প কারখানায় এই জরিপ চালানো হয়। জরিপে আরও দেখা গেছে, প্রায় ২৪ থেকে ৪৬ শতাংশ হস্তশিল্প উদ্যোক্তা ক্রেতার অভাব, অর্থনৈতিক মন্দা, বিপণন সমস্যা, কাঁচামাল এবং শ্রম ব্যয়ের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
সম্প্রতি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের হস্তশিল্পের বিকাশে করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে পিকেএসএফের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, শত শত কোটি টাকার দেশীয় বাজার ও বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক বাজার থাকা সত্ত্বেও সরকারি-
বেসরকারি পরিকল্পনা, গবেষণা, ডিজাইন
উন্নয়ন এবং নীতিসহায়তা ছাড়া এ খাতের সম্ভাবনাকে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এর জন্য সহজ শর্তে অর্থায়ন, বাজার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, নকশাকেন্দ্র স্থাপন, প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি প্রচারণা জোরদারের সুপারিশ করা হয়।
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের বলেন, সহজ শর্তে অর্থায়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং রপ্তানি সহজীকরণসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে এ খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ জন্য তিনি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্বে এ খাতকে আরও সংগঠিত, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পে রূপান্তর করার পরামর্শ দেন।
- বিষয় :
- হস্তশিল্প
