ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সর্বজনীন পেনশন

আপাতত ট্রেজারি বিল বন্ডে তহবিল বিনিয়োগ

আপাতত ট্রেজারি বিল  বন্ডে তহবিল বিনিয়োগ
×

মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১০ | আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৮:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সর্বজনীন পেনশন তহবিলের অর্থ আপাতত ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হবে। পাশাপাশি সুদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও মূল বিনিয়োগ আলাদাভাবে হিসাব সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের তহবিল ব্যবস্থাপনা কমিটির দ্বিতীয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। পেনশন কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে সম্প্রতি তহবিল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফার সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যপত্র সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

কার্যপত্রের তথ্যমতে, সভায় জানানো হয়, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় চাঁদা হিসেবে জমা হয়েছে প্রায় ২২০ কোটি টাকা। অর্জিত মুনাফাসহ বর্তমানে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়েও কি শুধু ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা হবে, না অন্য ক্ষেত্রে– সে বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনায় কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এইচ. এম. মোশাররফ হোসেন বলেন, সুদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ, যা পুনরায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা আলাদাভাবে প্রদর্শন ও হিসাব সংরক্ষণ করা উচিত। কমিটির অন্যান্য সদস্যও এ প্রস্তাবে একমত পোষণ করেন। সভায় সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, চাঁদা থেকে প্রাপ্ত অর্থ ও সুদ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা আলাদা আলাদাভাবে হিসাব রাখা হবে।

সভায় বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ বিধিমালার আলোকে বিনিয়োগের খাত নিয়েও আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে সভাপতি গোলাম মোস্তফা জানান, বর্তমানে ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলেই বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে পোর্টফোলিও সম্প্রসারণের প্রয়োজন হবে। আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বলেন, ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলের পাশাপাশি সুকুক বন্ডেও বিনিয়োগের বিষয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) প্রতিনিধি বলেন, পাবলিক ইস্যু বিধিমালা অনুযায়ী সর্বজনীন পেনশন তহবিলকে যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে ভালো আইপিওতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। অর্থ বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, পেনশন তহবিলের অর্থ অবশ্যই নিরাপদ ইনস্ট্রুমেন্টের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগের লক্ষ্যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। 

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলেই বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা হবে। এ দুটি লাভজনক এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মাধ্যমে পাবলিক ইস্যু বিধিমালা সংশোধন করে সর্বজনীন পেনশন তহবিলকে যোগ্য বিনিয়োগকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ভবিষ্যতে আইপিওসহ নতুন কোনো খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। 

বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ প্রসঙ্গে মো. গোলাম মোস্তফা জানান, পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এখনও খুব বেশি নয়। তবে ভবিষ্যতে গ্রাহক সংখ্যা ও তহবিলের পরিমাণ বাড়লে বিনিয়োগের নতুন নতুন খাত চিহ্নিত করার প্রয়োজন হবে। তিনি আরও বলেন, ট্রেজারি বন্ড ও ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করা এবং একক খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। সভায় উপস্থিত অন্য সদস্যরা এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

সভায় তহবিল ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনা হয়। জানানো হয়, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের আইটি ইউনিট বর্তমানে তহবিল ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। তহবিল ব্যবস্থাপনা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করতে আলাদা একটি মডিউল সংযোজনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে বিবেচনায় রয়েছে।

ছয় খাতে বিনিয়োগের বিধিমালা
এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে সর্বজনীন পেনশন তহবিল (বিনিয়োগ ও সংরক্ষণ) বিধিমালার গেজেট জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। গেজেট অনুযায়ী, পেনশন কর্মসূচির আওতায় জমা হওয়া অর্থ বিনিয়োগে কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে ছয়টি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে– সরকারি ট্রেজারি বন্ড, বিল, সুকুক বা এ ধরনের সরকারি সিকিউরিটিজ, তপশিলি ব্যাংকে স্থায়ী আমানত, শেয়ারবাজরের মিউচুয়াল ফান্ড, এ ক্যাটেগরির বন্ড এবং সরকারের অবকাঠামো খাতে উন্নয়ন প্রকল্প। তহবিল ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্ব ও কার্যাবলি প্রসঙ্গে বলা হয়, আর্থিক বাজার, পুঁজিবাজারসহ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্র পর্যালোচনা করে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক লাভজনক পোর্টফোলিও বা খাতে বিনিয়োগের সুপারিশ 
প্রদান করবে। 

সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম পরিস্থিতি
দেশের বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টেকসই ও সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যে ২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, পুরোপুরি প্রস্তুতি না নিয়েই ভোটের আগে জনগণকে তুষ্ট করতে তড়িঘড়ি করে এ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল। সে সময় প্রস্তুতির ঘাটতির অভিযোগ তুলে এ কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন অর্থনীতিবিদরাও। 

একই সঙ্গে এতে অন্তর্ভুক্তির চাঁদা ও পরবর্তী সময়ে পেনশন সুবিধা পাওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। শুরুর দিকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের আগ্রহ দেখা গেলেও পরে তা আর ধরে রাখা যায়নি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর থেকে যুক্ত হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের পেনশন সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আন্দোলনের মুখে সে অবস্থান থেকে সরে আসে সরকার। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও বেশি দূর এগোয়নি। সার্বিকভাবে কর্মসূচিতে নেমে আসে এক ধরনের স্থবিরতা।

তবে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সর্বজনীন পেনশন কার্যক্রম জোরদার ও জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বেশ কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গত নভেম্বর শেষে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির আওতায় চারটি স্কিমে প্রায় তিন লাখ ৭৮ হাজার জন মাসিক চাঁদা জমা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×