কাঁচামাল সংকটে থমকে আছে শিল্পের অগ্রগতি
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন আসছে মানুষের রুচি ও খাদ্যাভ্যাসে। উৎপাদিত পণ্যেও আসছে নানা বৈচিত্র্য ও স্বাদ। ফলে চাহিদা বাড়ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের। এতে
স্থানীয় বিনিয়োগ বেড়ে বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ছয় বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে আয়ও হচ্ছে শতকোটি ডলার।
কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উদীয়মান এ শিল্পে সবচেয়ে বড় বাধা কাঁচামাল সংকট। এ সম্পর্কিত কিছু কৃষিপণ্য দেশে উৎপাদন হলেও সেগুলো পুরোপুরি শিল্পোপযোগী নয়। আবার কিছু পণ্য পর্যাপ্ত উৎপাদন হলেও সেগুলো সংরক্ষণে নেই আধুনিক ব্যবস্থা। ফলে কাঁচামালের সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। কোনো কারণে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে ব্যাাপক সংকট দেখা দেয়। তখন গুনতে হয় বাড়তি অর্থ। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আবার বন্দরে পণ্য আটকে গেলে ব্যাহত হয় উৎপাদন।
তাদের মতে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও পণ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। খুঁজতে হবে কাঁচামাল আমদানির বিকল্প বাজার। কৃষকের পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করতে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। উচ্চ উৎপাদনশীল চাষাবাদে প্রশিক্ষণ দেওয়া ও কৃষিজমি রক্ষার পদক্ষেপও থাকতে হবে।
কাঁচামালের বেশির ভাগ আমদানি
দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে জুস, ক্যান্ডি, মসলা, মিষ্টি, রুটি, বিস্কুট, চানাচুর, নুডলস ইত্যাদি পণ্য। এসব পণ্যের বেশ কয়েকটির মূল উপাদান গম। খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গমের চাহিদার ১৫ শতাংশও মেটে না স্থানীয় উৎপাদনে। ফলে ৮৫ শতাংশই আমদানি করা লাগে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে ৫৯ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে, যার সিংহভাগই এসেছে রাশিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া থেকে। বৈশ্বিক যুদ্ধ-বিদ্রোহ দেখা দিলে আমদানি ব্যাহত হয়। এ জন্য ধান, গম, সবজি, ফলমূল, ডাল, চিনি, আলু, মসলাজাতীয় পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত মৌসুমে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন গম উৎপাদন হয়েছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শীর্ষ গম উৎপাদন এলাকা ঠাকুরগাঁও সদরের বালিয়াডাঙ্গী এলাকার কৃষক হোসেন আলী সমকালকে বলেন, বীজ কিনতে ভোগান্তি হয়, দামও বেশি। এক বিঘা জমিতে গম উৎপাদনে খরচ হয় ১০ হাজার টাকার মতো। কিন্তু গম ২২ থেকে ২৫ মণের বেশি হয় না। এতে লাভ কম হয়। তাই গমের আবাদ কমিয়ে কৃষক ভুট্টাসহ অন্য ফসল ফলাচ্ছেন।
অন্যদিকে কিছু পণ্যের ব্যাপক উৎপাদন বাড়লেও সেগুলোর বিকল্প ব্যবহার কিংবা রপ্তানির যথাযথ উদোগ নেই। যেমন গত মৌসুমে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত ছিল। তাতে কৃষক বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ন্যায্য দর না পেয়ে
চাষিরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। আলুর বিকল্প ব্যবহার বাড়ানো ও রপ্তানিতে প্রণোদনা না দিলে ভবিষ্যতে উৎপাদন কমে যাবে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) তথ্যমতে, দেশে কৃষিপণ্যের মাত্র ১ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়। অন্যদিকে ভিয়েতনামে ৫ শতাংশ, চীনে ৩৮, ফিলিপাইনে ৩১, আমেরিকায় ৭০, থাইল্যান্ডে ৮১ ও মালয়েশিয়ায় ৮৪ শতাংশ কৃষিপণ্য কোনো না কেনোভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়। এ প্রসঙ্গে মোস্তফা আজাদ বলেন, আলু দিয়ে নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বানানো যায়। বড় কোম্পানিগুলো আলুর আরও বিকল্প ব্যবহার বাড়াতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে বাজার
ব্যবসায়ীরা জানান, ব্র্যান্ডেড, রেডি-টু-ইট মিল এবং হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এতে দ্রুত বড় হচ্ছে স্থানীয় প্যাকেটজাত খাদ্যের বাজার। এ খাতের বর্তমান বাজার ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার হলেও ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৫ দশমিক ৮ বিলিয়নে পৌঁছাবে। বিস্কুট ও নুডলসের মতো পণ্যগুলো ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে স্থান দখল করেছে। বিডার তথ্যমতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ৩৮ কোটি ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বর্তমানে জিডিপিতে প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ, আর মোট উৎপাদন খাতে ৮ শতাংশ অবদান রাখে।
ইউনাইটেড স্টেটস ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) তথ্যমতে, বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত খাতের বাজার বছরে গড়ে ৮ শতাংশ হারে বাড়ছে। এভাবেই তৈরি পোশাকের পর সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্প। বর্তমানে এ খাতের পণ্য ১০৬টি দেশে রপ্তানি হয়। রপ্তানি আয় পৌঁছেছে প্রায় ৪০ কোটি ডলারে। রপ্তানি বাড়ানোর আরও সুযোগ থাকলেও মানসম্পন্ন কাঁচামাল সংকট, ফসল অপচয় এবং কাঠামোগত দুর্বলতা এ খাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাণ গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সমকালকে বলেন, কাঁচামালের অধিকাংশই স্থানীয়। শিল্পের উপযোগী মানসম্পন্ন কৃষি উৎপাদন বাড়লে কাঁচামাল সহজলভ্য হবে। তাতে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়বে। এতে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য কৃষকদের সহজে ঋণ ও সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দরকার।
মানুষের আয় যত বাড়বে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা তত বেশি বাড়বে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ব্র্যান্ড ও হালালভিত্তিক পণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে। সে জন্য কাঁচামাল সহজলভ্য করতে দক্ষ জনশক্তি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, উৎপাদনে বৈচিত্র্য, শিল্প ও পণ্যভিত্তিক চাষাবাদে যেতে হবে।
উৎপাদন বাড়লেও শিল্পোপযোগী পণ্য কম
অতিবৃষ্টি বা খরা, বন্যাসহ নানা কারণে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবুও উৎপাদন বাড়ছে কৃষিপণ্যের। বিবিএসের হিসাবে, কৃষি উৎপাদন বার্ষিক ১০ কোটি টন ছাড়িয়েছে। কিন্তু শিল্পের জন্য উপযুক্ত ও নির্দিষ্ট পণ্যের অভাব প্রকট। উৎপাদিত ফসলের প্রক্রিয়াজাতকরণের হারও অনেক কম; আম, টমেটো, আলু ও মরিচের মাত্র ২ থেকে ৬ শতাংশ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চফলনশীল বীজ, প্যাকেজিং উপকরণ এবং আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদসহ নানা কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এ ছাড়া কৃষক ও প্রক্রিয়াজাতকারীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগের অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর পরিবহন ব্যবস্থার কারণে খরচ বেড়ে যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব সমস্যা সমাধানে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ বাড়িয়ে কৃষকের সঙ্গে শিল্পকারখানার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। উৎপাদনে উত্তম কৃষিচর্চা ও নিরাপদ খাদ্য মান নিশ্চিত, উৎপাদন এলাকায় সংরক্ষণাগার, হিমাগার ও প্রি-প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করতে হবে। কৃষি ও শিল্প খাতে সমন্বিত নীতি ও প্রণোদনা প্রদান, চাষিদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সংরক্ষণজনিত ক্ষতি ৩০-৪৫ শতাংশ
এ খাতে বড় ক্ষতি হলো উৎপাদন-পরবর্তী বিপুল পরিমাণ অপচয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক হিসাবে দেখা গেছে, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দুর্বল লজিস্টিকস এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামোর অভাবে বাংলাদেশে বছরে মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। তবে কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে, এর পরিমাণ ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দৈনিক ১০-১২ ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যা হিমাগারনির্ভর পণ্যগুলোর গুণমান নষ্ট করে।
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মাকহাটি গ্রামের কৃষক মইন উদ্দিন সমকালকে বলেন, পচনশীল কৃষিপণ্য হিমাগারে সংরক্ষণ করলে খরচ বেশি হয়। আবার দেশীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষণে নষ্ট হয়ে যায়। সরকার কম খরচে হিমাগারের ব্যবস্থা করলে কৃষক উপকৃত হবে। একই সঙ্গে পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর অভিযোগ, বড় কোম্পানিগুলো টমেটো, আলুসহ কিছু পণ্য কৃষকের কাছ থেকে কিনলেও সেগুলোর নামমাত্র মূল্য দেয়।
উৎপাদন বাড়াতে করণীয়
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্মত পণ্য উৎপাদন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ, নতুন জাত বিশেষ করে বাণিজ্যিক জাত উদ্ভাবন ও কৃষিকে আধুনিকায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, পণ্য বহুমুখীকরণ, সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিতকরণ, উদ্ভাবন, গবেষণা ও উন্নয়নে জোর দেওয়া দরকার।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে কৃষক পণ্য উৎপাদন করেন না। শিল্পের উপযোগী কাঁচামাল পেতে হলে উদ্যোক্তাদের কৃষকের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদে যেতে হবে। তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
প্রক্রিয়াজাত শিল্পে সরকারের নীতিসহায়তা জরুরি উল্লেখ করে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ঋণের উচ্চ সুদ, ঋণপত্র খোলায় জটিলতা ও নানা কারণে বন্দরে পণ্য আটকে থাকায় উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ধীর ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি কৃষি কৌশলগত পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি মাসেই এ পরিকল্পনার চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করা হবে। এতে কৃষির ১৩টি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, কাঁচামালের সংকট সমাধানে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেই বিষয়ে উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিলে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।
এবার প্রায় ২৭ লাখ টন আম উৎপাদন হয়েছে। রপ্তানি হয়েছে ২৩শ টনের মতো। একইভাবে এক কোটি ৩০ লাখ টন আলু উৎপাদনের বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ৭০ হাজার টনের মতো। এই প্রসঙ্গ টেনে কৃষি সচিব বলেন, শুধু কাঁচামালের সংকট বলে সরকারের ওপর দায় দিলে হবে না। এই পণ্যগুলো দিয়ে নানা প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। উৎপাদনকারীদের সেসব বিষয়ে উদ্যোগ থাকতে হবে।
- বিষয় :
- কাঁচামাল
