ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইইউর বাজার নিয়ে উদ্বেগ বেশি

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইইউর বাজার নিয়ে উদ্বেগ বেশি
×

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও জোটগত হিসেবে ২৭ জাতির ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রধান দুই গন্তব্য। প্রধান পণ্য তৈরি পোশাকের মোট রপ্তানি আয়ের ৭০ শতাংশই আসে এই দুই বাজার থেকে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্কের শঙ্কা এবং একপর্যায়ে শুল্ক আরোপের ঘটনা ছাপিয়ে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে। প্রচলিত অন্য বাজার কানাডা ও যুক্তরাজ্যেও রপ্তানি বেড়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি কমে গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। গত বছর তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। এই আয় আগের বছরের চেয়ে আহামরি বেশি নয়। এক বছরে বেড়েছে ১ শতাংশেরও কম হারে। অথচ পোশাক খাতের গত এক দশকের গড় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের মতো। 
রপ্তানিকারক উদ্যোক্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাবেই গত বছর রপ্তানি আশানুরূপ হয়নি। আগস্টে শুল্ক আরোপের ঘোষণা এলেও আগে থেকেই এ নিয়ে আলোচনা ছিল। সে কারণে ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল। তারা রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দেয়। 

নিট পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীন ও ভারতের ওপর পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। এত বেশি শুল্ক দিয়ে ওই সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে ভালো করতে পারছিল না। তারা কম শুল্কের বাজার ইইউতে আগ্রাসী রপ্তানি শুরু করে। নিজস্ব কাঁচামালের সুবিধায় কম দামে সেখানে রপ্তানি বাড়িয়ে বাজার দখলে নিয়েছে তারা। এ কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে গেছে। এ কারণে গত বছর পোশাক রপ্তানি মাত্র ১ শতাংশের মতো বেড়েছে, যা সচরাচর ১০ শতাংশের ওপরে থাকে। 
গত বছরের রপ্তানি চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাল্টা শুল্ক আরোপের আগ পর্যন্ত মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল দেশের সার্বিক রপ্তানি চিত্র। এই পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার মাস আগস্টে বছরের প্রথম বারের মতো রপ্তানি পতন শুরু হয়। মাসটিতে রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমে যায় ৩ শতাংশ। সেই 
পতন আর বন্ধ হয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে রপ্তানি কম আসে ৫ শতাংশ। অক্টোবর মাসে রপ্তানি আরও বেশি হারে কমে, প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। নভেম্বর রপ্তানি কম হয় ৬ শতাংশ। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে রপ্তানি কমেছে ১৪ শতাংশ। 

এর আগ পর্যন্ত রপ্তানিপ্রবণতা থেকে দেখা যায়, বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে সার্বিক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি ছিল। পরের মাসে রপ্তানি বাড়ে ৩ শতাংশের মতো। মার্চ মাসে আরও বেড়ে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১১ শতাংশেরও বেশি। এর মধ্যে এপ্রিলে ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে রপ্তানি গতি কমে আসে। ওই মাসে রপ্তানি বেশি ছিল ১ শতাংশের মতো। মে মাসে আবার রপ্তানি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। জুন মাসে আবার ঈদুল আজহার ছুটির কারণে রপ্তানি সাড়ে ৭ শতাংশ কম হয়। প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা সাধারণত এই দুই ঈদেই ছুটি কাটিয়ে থাকেন। প্রতি ঈদে ৭ থেকে ১০ দিনের মতো কারখানা বন্ধ থাকে। 
এরপর জুলাই মাসে রপ্তানি বাড়ে বছরের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। তারপর নেমে আসে শুল্কের খড়গ। ঠিক তখন থেকেই হঠাৎ রপ্তানিতে ছন্দপতন ঘটে। ব্র্যান্ড-ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ কমিয়ে দেন। চলমান রপ্তানি আদেশও বাতিল কিংবা স্থগিত হয়। রাতারাতি কমে যায় রপ্তানি আয়। 

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে ৬০ দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশসহ বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তখন বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়, যা কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ এপ্রিল। কার্যকরের দিন তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা স্থগিত করা হয়। তিন মাসের এ শুল্ক বিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে গত ৯ জুলাই বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের ওপর নতুন করে শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তখন বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২ শতাংশ কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। ১ আগস্ট থেকে এই হার কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এরমধ্যে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনায় ১ আগস্ট বাংলাদেশের পণ্যে পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়, যা ওই দিন থেকেই কার্যকর হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যে চূড়ান্ত শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের হিস্যা বেড়েছে 
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৭৫৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক। আগের বছর ২০২৪ সালে যা ছিল ৭২০ কোটি ডলার। এ হিসাবে এক বছরে মার্কিন মুল্লুকে রপ্তানি বেড়েছে ৩৪ কোটি ডলার। বেশি রপ্তানি আয়ের সুবাদে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের হিস্যা এখন ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগের বছর যা ছিল ১৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। 
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেখানে নিটের চেয়ে ওভেনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিটের রপ্তানি পরিমাণ ছিল ২৬৫ কোটি ডলারের কিছু কম। সেখানে ওভেনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৪৯০ কোটি ডলার। ২০২৪ সালেও একই প্রবণতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে। ওই বছর নিটের ২৪৬ কোটি ডলারের বিপরীতে ওভেনের রপ্তানি ছিল ৪৭৫ কোটি ডলার। 

বিপরীত চিত্র ইইউর বাজারে
জোটগত প্রধান বাজার ইইউতে গত বছর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৯৩০ কোটি ডলারের পোশাক, যা আগের বছর ছিল ১ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার। নিট এবং ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক বিপরীত ইইউ। সেখানে নিটের ব্যবহার বেশি। গত বছর ইইউতে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ১৬৯ কোটি ডলারেরও বেশি; যেখানে ওভেন পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭৬১ কোটি ডলারেরও কম। আগের বছরও একই প্রবণতা ছিল ইইউর দেশগুলোতে। ২০২৪ সালে ৭৪৩ কোটি ডলারের ওভেনের বিপরীতে নিট পোশাক রপ্তানি হয় ১ হাজার ১৬৬ কোটি ডলারের। 

গত বছর রপ্তানি কমে আসায় বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে ইইউর হিস্যা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ২০২৫ সাল শেষে এই হিস্যা এখন ৪৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের বছর যা ছিল ৫০ দশমিক ৪২ শতাংশ। সার্বিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপের পরও দেশটির তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার নিয়েই রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ এখন বেশি। 
ইউরোপে ওভেনের চেয়ে নিটের রপ্তানি বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই এই প্রবণতা চলছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে শার্ট রপ্তানি অর্থাৎ ওভেন রপ্তানি দিয়ে পোশাকের রপ্তানি শুরু হয়, সে কারণে সেভাবেই একটা বাজার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ওভেনের চেয়ে নিটপণ্য ওজনে ভারী হয়ে থাকে। যে কারণে পরিবহন ব্যয় বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপ বাংলাদেশের কিছুটা কাছে হওয়ায় পরিবহন ব্যয় সেখানে কিছুটা কম। সে কারণে ইউরোপে ওভেনের চেয়ে নিটের চাহিদা বেশি। ঠিক একই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য পৌঁছাতে পরিবহন ব্যয় বেশি হওয়ায় তুলনায় পাতলা পণ্য ওভেনের রপ্তানি বেশি সেখানে। 

কমেছে অপ্রচলিত বাজারের হিস্যাও
পাল্টা শুল্কের প্রভাব পড়েছে ইউরোপে মতো অপ্রচলিত শ্রেণির বাজারগুলোতেও। গত বছর অপ্রচলিত বা নতুন বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে হয় ৬২৫ কোটি ডলার, যা আগের বছর ছিল ৬৩০ কোটি ডলারেরও বেশি। রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে অপ্রচলিত বাজারে হিস্যা কমে ১৬ দশমিক ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের বছর যা ছিল ১৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অপ্রচলিত বাজারে ওভেন ও নিটের চাহিদায় তেমন তফাৎ নেই। সমান চাহিদা দুই ধরনের পোশাকেই। 
ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাইরের দেশগুলোকে অপ্রচলিত শ্রেণির বাজার বলা হয়। রপ্তানির পরিমাণের দিক থেকে প্রচলিত বাজারের বাইরে শীর্ষ ১০ রপ্তানি বাজারের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, চীন, ভারত, সৌদি আরব, মেক্সিকো, ব্রাজিল, চিলি, তুরস্ক ও রাশিয়া। 

ওভেনের চেয়ে নিটের রপ্তানি বেশি 
রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে প্রধানত দুই ধরনের পণ্য রয়েছে। নিট ও ওভেন। নিট বলতে সম্প্রসারণশীল কাপড়ে তৈরি গেঞ্জি জাতীয় পোশাককে বোঝানো হয়। বিভিন্ন ধরনের গেঞ্জি, সোয়েটার, আন্ডারওয়্যার, মোজা, পাজামা এগুলো হচ্ছে নিটের প্রধান পণ্য। অন্যদিকে অসম্প্রসারণশীল শক্ত কাপড়ে তৈরি পোশাককে ওভেন জাতীয় পোশাক বলা হয়। শার্ট, প্যান্ট, সাটিন, শুটিং, জ্যাকেট ও ডেনিম ইত্যাদি ওভেনের প্রধান পণ্য। 
এই দুই খাতের মধ্যে এক সময় ওভেনের রপ্তানি বেশি থাকলেও গত আট বছর ধরে নিটের রপ্তানি বেশি হচ্ছে। গত বছরের রপ্তানি প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওভেনের চেয়ে নিটের বেশি রপ্তানি প্রবণতা অব্যাহত আছে। গত বছর নিট পোশাকের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮১ কোটি ডলার সমপরিমাণ, যা ওভেনে ছিল ১ হাজার ৮০১ কোটি ডলারের সামান্য কিছু বেশি। ২০২৪ সালে এই দুই খাতের রপ্তানি হিস্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৫৩ কোটি ডলার ও ১ হাজার ৭৯৫ কোটি ডলার।

আরও পড়ুন

×