ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মেট্রোরেলে আরও ১০ বছর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব

মেট্রোরেলে আরও ১০ বছর  ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব
×

জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মেট্রোরেলের যাত্রীসেবার ওপর আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ আরও ১০ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। বর্তমানে বলবৎ থাকা ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন ২০৩৬ পর্যন্ত এই সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সুপারিশ পাঠাতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাজস্ব আয়ে ক্ষতি সত্ত্বেও জনস্বার্থে শুরু থেকেই ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে মেট্রোরেলে। তবে এখন অব্যাহতির বিষয়ে সুরাহা হবে জাতীয় সংসদ থেকে। এনবিআর থেকে নয়। ভবিষ্যতে ভ্যাট মওকুফ করা হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত সরকার নেবে। 
এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে ডিএমটিসিএল ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাবের পক্ষে ১৭টি যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মেট্রোরেল একটি ‘ইনফ্যান্ট ইন্ডাস্ট্রি’ বা উদীয়মান শিল্প এবং এর স্থায়িত্ব ও জনগণের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় এই অব্যাহতি প্রয়োজন।

ভ্যাট না আদায়ের প্রধান কারণ
চিঠিতে বলা হয়, মেট্রোরেলের যাত্রীদের কোনো আলাদা ‘ক্লাস’ বা শ্রেণিবিন্যাস নেই। এ ছাড়া ভাড়ার সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত করলে স্বয়ংক্রিয় টিকিট ভেন্ডিং মেশিনে ভাঙতি টাকা লেনদেনে বড় ধরনের কারিগরি জটিলতা তৈরি হবে। যেমন, ভাড়ার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে প্রথম স্ল্যাবের ভাড়া দাঁড়াবে ২৩ টাকা এবং দ্বিতীয় স্ল্যাবে ৩৪ টাকা। বর্তমান মেশিনগুলো ১০ টাকার গুণিতক নোট গ্রহণ ও ফেরত দিতে সক্ষম, তাই ক্ষুদ্র অঙ্কের ভাঙতি দেওয়া সম্ভব হবে না।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
ডিএমটিসিএল জানায়, বিশ্বব্যাপী মেট্রোরেল শুধু ভাড়ার আয়ে লাভজনকভাবে চালানো সম্ভব হয় না। ভাড়ার আয় থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ খরচ মেটানো যায় এবং বাকি অংশ সরকারকে ভর্তুকি দিতে হয়। বাংলাদেশেও জনসাধারণের সাধ্যের মধ্যে ভাড়া রাখতে বাস ভাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এমআরটি লাইন-৬ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকলে দৈনিক যাতায়াত সময় খরচ বাবদ আট কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং যানবাহন পরিচালনা খরচ বাবদ এক কোটি ১৮ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে।

পরিবেশ ও কর্মসংস্থান
মেট্রোরেল সম্পূর্ণ বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় এতে কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হয় না, যা বছরে দুই লাখ দুই হাজার ৭৬২ টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করবে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বাস্তবায়িত হলে ডিএমটিসিএলের অধীনে সরাসরি ১২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থান হবে এবং সহযোগী শিল্পে আরও চার গুণ বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ঋণের দায় ও অন্য দেশের উদাহরণ
এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিএমটিসিএল ইতোমধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের ছয়টি কিস্তিতে মোট ১০৬ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লি মেট্রোরেলে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কার্যক্রম চললেও সেখানে যাত্রীসেবার ওপর কোনো ভ্যাট নেই। এ ছাড়া জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর ১০ বছর পর্যন্ত ‘ট্যাক্স হলিডে’ সুবিধার উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম মেট্রোরেল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর। সর্বপ্রথম উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের উদ্বোধন করা হয়। পরদিন ২৯ ডিসেম্বর এটি সাধারণ জনগণের যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর থেকে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশেও ট্রেন চলাচল শুরু হয়। মেট্রোরেল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও শুরু থেকেই এর টিকিটে ভ্যাট মওকুফ ছিল। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মেট্রোরেল সেবার ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। 

এনবিআর সূত্র বলছে, এটি যানজট নিরসন এবং কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। জনস্বার্থ বিবেচনা করে এবং পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক এই গণপরিবহনকে আরও জনপ্রিয় করতে ভ্যাট মওকুফ করা হয়েছে। যদিও সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জানানো হয়, ভ্যাট না নেওয়ার ফলে সরকারের বছরে প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। তা সত্ত্বেও ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় মেট্রোরেলের যুগান্তকারী ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ সহনীয় রাখার স্বার্থে সরকার এই ক্ষতি মেনে নিচ্ছে। তবে এনবিআর জানিয়েছিল, যদি পূর্ণ ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয় তাহলে সরকার ৭০ থেকে ১০০ কোটি রাজস্ব পেতে পারে। 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট নীতি ও বাস্তবায়ন) মো. আজিজুর রহমান সমকালকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এক বছরের বেশি ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে এখন অব্যাহতি দিতে হলে সেটি জাতীয় সংসদে পাস হতে হবে। কারণ নির্বাচিত সরকার এসেছে। তাদের চিঠির বিষয়ে সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। অব্যাহিতর ব্যাপারে সংসদ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

আরও পড়ুন

×