ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ভারতে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই নিবন্ধন বাতিলে মামলা

আইনজীবীর ফি পরিশোধে অনুমতি চায় শিল্প মন্ত্রণালয়

আইনজীবীর ফি পরিশোধে  অনুমতি চায় শিল্প মন্ত্রণালয়
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল’। অথচ টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য। ভারতে টাঙ্গাইল নামে কোনো ভৌগোলিক এলাকাও নেই। এ পরিপ্রেক্ষিতে নিবন্ধনটি বাতিলে ভারতের মাদ্রাজ হাইকোর্টে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এ মামলা দায়ের করে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় নিয়োজিত ভারতীয় আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের ফি পরিশোধে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চেয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই মামলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠান ম্যাসন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের দুটি বিলের মোট ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬০ ভারতীয় রুপি বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা থেকে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারত কর্তৃক দেওয়া জিআই স্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণে গঠিত সমন্বিত টাস্কফোর্স কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতের আদালতে আপিলের পূর্বপ্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় দলিলপত্র তৈরির জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী ম্যাসন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস দুটি বিল দাখিল করেছে। একটি ১ লাখ ৩০ হাজার ৬০ রুপি এবং অন্যটি ২ লাখ ৪৫ হাজার রুপির।

এর আগে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া এবং আইনজীবী নিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদনের তথ্য চাওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী শিল্প মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে পুনরায় প্রস্তাব পাঠিয়েছে। অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা সমকালকে জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই চিঠিটি হাতে পেয়েছেন। পর্যালোচনা শেষে শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পক্ষ থেকে ‘টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল’ নামে জিআই স্বীকৃতি দেওয়ার পর বাংলাদেশে এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ব্যবসায়ী, জিআই বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞরা বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য, ভারতের যে অঞ্চলে শাড়ি উৎপাদিত হচ্ছে সেখানে ‘টাঙ্গাইল’ নামে কোনো ভৌগোলিক এলাকাই নেই।
এরপর পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) দ্রুত উদ্যোগ নেয়। জেলা প্রশাসনের আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল শাড়িসহ তিনটি পণ্যের জিআই স্বীকৃতির আবেদন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। অন্য দুটি পণ্য ছিল গোপালগঞ্জের রসগোল্লা এবং নরসিংদীর অমৃত সাগর কলা। দুই মাসের আপত্তিকাল অতিক্রমের পর টাঙ্গাইল শাড়ি আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই স্বীকৃতি পায়।

জিআই স্বীকৃতির মাধ্যমে কোনো দেশের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে সম্পৃক্ত পণ্য আইনি সুরক্ষা পায়। এটি দেশীয় বাজারে নকল প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্র্যান্ডমূল্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ভারতে টাঙ্গাইল শাড়ি সম্পর্কিত জিআই স্বীকৃতির পর বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মেধাস্বত্ববিষয়ক মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আনন্দ অ্যান্ড আনন্দ এবং ম্যাসন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস নামে ভারতীয় দুটি আইনি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। ব্যয় ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় ম্যাসন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ‘আইনসংক্রান্ত ব্যয়’ খাতে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ইতোমধ্যে ওই খাত থেকে কিছু ব্যয় হওয়ায় অবশিষ্ট অর্থ থেকেই আইনজীবীর বিল পরিশোধের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

উৎপত্তি ও ঐতিহ্য
টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তি বর্তমান বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলায়। সূক্ষ্ম সুতা, হালকা বুনন, জামদানি প্রভাবিত নকশা এবং আরামদায়ক গঠন এই শাড়ির বৈশিষ্ট্য। মোগল আমল থেকে বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরা শাড়ি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পরে বিভিন্ন জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁতশিল্প বিস্তৃত হয়।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর কিছু তাঁতি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান এবং সেখানে একই কৌশলে শাড়ি উৎপাদন অব্যাহত রাখেন। ভারতের দাবি, এই ধারাবাহিকতার ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদিত শাড়ির জিআই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ ও এ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐতিহাসিক উৎপত্তি ও ভৌগোলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে টাঙ্গাইল শাড়ির মূল স্বত্ব বাংলাদেশের।
জিআই বিরোধ কেবল আইনি প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ও। টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গে যুক্ত হাজারো তাঁতি, বিশেষ করে নারীকর্মীর জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বতন্ত্র পরিচয় নিশ্চিত করতে হলে প্রামাণ্য দলিল, গবেষণা ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এখন নজর থাকবে ভারতের আদালতে বাংলাদেশের অবস্থান কীভাবে উপস্থাপিত হয়। টাঙ্গাইল শাড়ি ঘিরে এই আইনি লড়াই ঐতিহ্য ও বাণিজ্য–দুটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
টাঙ্গাইল শাড়ির বৈধ স্বত্ব নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষা এবং দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত রাখা সরকারের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জিআই স্বীকৃতি প্রাপ্তি এবং ভারতীয় আদালতে আপিলের মামলা চলমান হওয়ায় বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ও আইনি গুরুত্ব বহন করছে।

আরও পড়ুন

×