বাংলা কিউআর কোডে লেনদেনে যেসব সুবিধা থাকছে
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
এখনকার মতো একেক ব্যাংক বা এমএফসের জন্য আলাদা কিউআর (কুইক রেসপন্স) কোড আর থাকছে না। আগামী জুনের মধ্যে সব ব্যাংক, এমএফএসের জন্য অভিন্ন বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন চালুর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো ব্যাংক বা এমএফএস এই নির্দেশনা পরিপালনে ব্যর্থ হলে জরিমানা, শাস্তিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুদি দোকানসহ মার্চেন্টগুলোতে বাংলা কিউআর রয়েছে কিনা তা যাচাই করা হবে।
অনেকের মনে প্রশ্ন–বাংলা কিউআর কী? এই ব্যবস্থা চালু হলে গ্রাহক হিসেবে তিনি কী সুবিধা পাবেন। সহজ ভাষায় বললে বাংলা কিউআর হলো– দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (এমএফএস) অ্যাপভিত্তিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। এখানে যুক্ত সব ব্যাংক, এমএফএসের গ্রাহক একই বার কোড স্ক্যান করে পরিশোধ করতে পারেন। এজন্য আলাদা-আলাদা বার কোড রাখার দরকার হবে না। গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয়ের জন্য যা বড় একটি সুবিধা। এর ফলে আপনি যে অ্যাপে পরিশোধ করতে চান এই দোকানে সেই বার কোড আছে কিনা তা দেখার দরকার নেই। বাংলা কিউআরের বার কোড থাকলেই যে কোনো অ্যাপ থেকে গ্রাহক পরিশোধ করতে পারেন। দেখা গেলো, কোনো একটি দোকান বা অন্য কোনো জায়গায় হয়তো কেবল বিকাশের কিউআর কোড রয়েছে। এখন বিকাশের গ্রাহকই কেবল সেখানে পরিশোধ করতে পারবেন। অভিন্ন কিউআরের ফলে গ্রাহককে আর একাধিক অ্যাপ নামানোর দরকার পড়বে না। আবার দোকানদারকেও একাধিক বার কোড স্ক্যানার রাখতে হবে না।
আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়ানো, ঝুঁকিমুক্ত করা, কম খরচ ও দ্রুত সম্পন্ন করতে ২০২৩ সালে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক লেনদেন নিষ্পত্তির এ ব্যবস্থা চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৭ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশ লেনদেন ক্যাশলেস করার লক্ষ্যে এখন মুদি দোকান থেকে শুরু করে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের নতুন ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বা নবায়নের জন্য কিউআর পরিশোধের ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানে এ ব্যবস্থা রয়েছে কিনা তা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে যাচাইয়ের জন্য সংস্থাটিকে চিঠি দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার মার্চেন্ট ডিজিটাল পরিশোধ নিচ্ছে। এ ব্যবস্থার দ্রুত প্রসারে ট্রেড লাইসেন্সের পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি, পরিবহন, সরকারি ফি, সামাজিক সুরক্ষা ও খুচরা ব্যবসা খাতে ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্মার্টফোন ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে নাগরিকদের ডিজিটাল পেমেন্ট, সঞ্চয় ও ঋণসেবায় সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ইকো সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারি একটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাইভেট ক্রেডিট ব্যুরো বাস্তবায়নে ডেটা শেয়ারিং, বিকল্প ডেটা ব্যবহার, এপিআই এবং ওপেন ব্যাংকিং স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করার উদ্যোগও থাকছে। এছাড়া ডিজিটাল লেনদেন বিষয়ে জেলাভিত্তিক আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ক্যাশলেস লেনদেন বাড়ানোর মাধ্যমে পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনি কঠোরতা আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে সব ব্যাংক, এমএফএস, পিএসপি ও পিএসওগুলোকে তাদের সকল মার্চেন্ট পয়েন্টে নিজস্ব মালিকানার কিউআরের পরিবর্তে বাংলা কিউআর প্রতিস্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে বলেছে–এ সময়ের মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাংলা কিউআর চ্যানেলে লেনদেন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমন্বয় ও ইন্টারঅপারেবিলিটি নিশ্চিত করতে হবে। মার্চেন্ট পয়েন্টে গ্রাহকদের জন্য দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। মার্চেন্ট পয়েন্টে পরিশোধ ছাড়া কোনো ধরনের ক্যাশ আউট করলে তার বাংলা কিউআর বাতিল করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তারুণ্যের চাহিদা বিবেচনায় ক্যাশলেস লেনদেনের দিকেই এগোতে হবে। এক্ষেত্রে অভিন্ন কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন চালু করা গেলে সবার জন্য সুবিধা হবে। তিনি জানান, গত এক দশকে দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেম নগদ নির্ভরতা থেকে ক্রমেই ডিজিটাল কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বর্তমানে মোট লেনদেনের মূল্যের ৩০ শতাংশ এবং সংখ্যার ৪৯ শতাংশ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। অবশ্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এখনও নগদ অর্থের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এ অর্থ মুদ্রণ, সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় প্রতিবছর ২০ হাজার কোটি টাকার মতো খরচ হচ্ছে। আবার লেনদেনে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। লেনদেন ক্যাশলেস হলে– নগদ অর্থ কিংবা কার্ড বহন করতে হবে না। পেমেন্ট দ্রুত, নিরাপদ ও সুবিধাজনক হয়; যা লেনদেন মাধ্যমে প্রতারণা, জাল নোটের ঝুঁকি কমাবে। আবার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের বিক্রেতারা স্বল্প খরচে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।
- বিষয় :
- কিউআর কোড
