এখনও পুরোদমে চালু হয়নি পাট রপ্তানি
শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ থেকে
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কাঁচা পাট রপ্তানিতে বেশ কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করা হয়। এর ফলে কার্যত বন্ধ ছিল দেশের পাট রপ্তানি। ফলে পাটের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় মণপ্রতি প্রায় চার হাজার টাকা কম ছিল। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিটির মাধ্যমে পাট রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা উঠলেও এলসির মাধ্যমে রপ্তানি এখনও বন্ধ রয়েছে। ফলে পুরোদমে পাট রপ্তানি শুরু হতে পারছেন না। প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার টন পাটের জন্য বিদেশি ক্রেতারা ক্রয় আদেশ দিয়েও পাট নিতে পারছেন না। দেশ বঞ্চিত হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। কৃষকও উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছে না পাটের। শিগগিরই রপ্তানি পুরোপুরি শুরু না করলে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার কৃষক সোহরাব মিয়া। নিজের ও আত্মীয়স্বজনের উৎপাদিত পাট তিনি বিক্রি করেন নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কাছে। তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাট রপ্তানি বন্ধ ছিল। ফলে পাটের যে মূল্য হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে রপ্তানি শুরু হওয়ায় পাটের দাম কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে পাট বোনার মৌসুম শুরু হয়েছে। অনেক স্থানে পঞ্চাশ ভাগ পাট বোনা হয়ে গেছে। এখন যদি পাট রপ্তানি ভালোভাবে শুরু হতো তাহলে পাটের দাম বাড়ত। কৃষক উৎসাহিত হতো। তাদের খরচে পুষত। কারণ, এবার তেল ও সারের দাম বেশি। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ঝিনাইদহের এই কৃষকের কাছ থেকে পাট কিনে বিদেশে রপ্তানি করেন নারায়ণগঞ্জের সাদাত জুট এক্সচেঞ্জের মালিক দেলওয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সারাদেশে ৭০ লাখ বেল বা দুই কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার মণ পাট উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাট রপ্তানি বন্ধ থাকায় এর মূল্য ছিল মণপ্রতি পাঁচ হাজার টাকার নিচে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রপ্তানি শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়। সরকারের ঘোষণার পরে যার যার কাছে পাট রপ্তানির জন্য টিটি ও এলসি ছিল বিদেশি ক্রেতারা সেগুলোর সময় বাড়িয়ে দেয়। রপ্তানির ঘোষণার খবরে পাটের মূল্য বেড়ে যায়। তোষা পাট পাঁচ হাজার ৮০০ টাকার আশপাশে, মেস্তা পাঁচ হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা, সুতি পাট পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ হাজার ১০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পরে জানা যায় যে, এলসির মাধ্যমে পাট রপ্তানি বন্ধ। ফলে পাটের দাম আবার কমতে থাকে। বর্তমানে তোষা পাট মণে প্রায় ৭০০ টাকা কমে পাঁচ হাজার ১০০ টাকায়, মেস্তা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা কমে চার হাজার ৬০০ থেকে চার হাজার ৭০০ টাকা, সুতি পাট ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা কমে চার হাজার ২০০ থেকে চার হাজার ৪০০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অথচ বর্তমান সময়ে ভারতের কৃষকরা পাট বিক্রি করছে কমবেশি ৯ হাজার টাকা মণ।
বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট ভারত, ব্রাজিল, নেপাল, মিসর, পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন, ভিয়েতনাম, আরব আমিরাতে রপ্তানি হয়। সব দেশেই বর্তমানে বাংলাদেশের পাটের চাহিদা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ পাট রপ্তানি সেভাবে না করায় এসব দেশে এখন ভারতের পাট যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে ভারতের হাত ঘুরে পাট এসব দেশে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) চেয়ারম্যান খন্দকার আলমগীর কবির এ প্রসঙ্গে বলেন, টিটির ছয় হাজার ৩৭৭ টন এক্সপোর্টের অনুমোদন দেওয়ার কথা। এলসির পণ্য রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। রপ্তানি না হলে ১৫ থেকে ২০ লাখ বেল পাট রয়ে যাবে। ফলে ব্যবসায়ীদের টাকা আটকে থাকবে। তারা আগামী মৌসুমে পাট কম কিনবে। ফলে এ বছর সার, তেলের বেশি দাম দিয়ে উৎপাদন করা পাটের দাম আগামী মৌসুমে কৃষকরা পাবে না। সবার স্বার্থে এখন পাট রপ্তানি পুরোপুরি খুলে দেওয়া দরকার।
জানতে চাইলে বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদশে জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল বারিক খান সমকালকে বলেন, পাট নিয়ে নানান কারসাজি থাকে। কৃত্রিম সংকটের প্রবণতা আছে দীর্ঘদিন ধরে। কাঁচা পাট বেশি রপ্তানি হলে দেশের শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পাটের সংকট তৈরি হয়। বর্তমানে রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়, বরং শর্তসাপেক্ষে রপ্তানি করা হয়। তবে অবৈধ পথে কাঁচা পাট রপ্তানি আগের মতোই চলছে। কাঁচা পাট রপ্তানির বিষয়ে দেশের শিল্পের স্বার্থ আগে দেখা উচিত।
- বিষয় :
- পাট
