ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিমত

কৃষকের আয় বাড়াতে দরকার সমন্বিত কোল্ড চেইন উদ্যোগ

কৃষকের আয় বাড়াতে দরকার  সমন্বিত কোল্ড চেইন উদ্যোগ
×

তালহা জুবাইর মাসরুর

তালহা জুবাইর মাসরুর

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভোরের আলো ফুটতেই ক্ষেত থেকে তাজা সবজি তুলে কৃষক যখন বাজারের পথে রওনা দেন, তখন তার সামনে একটাই বাস্তবতা–আজই বিক্রি করতে হবে। কারণ সংরক্ষণের সুযোগ নেই। এক দিন দেরি হলেই পণ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই অনেক সময় উৎপাদন খরচের কাছাকাছি দামে হলেও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন তিনি।

বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনে আমরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি। বছরে প্রায় চার কোটি টনেরও বেশি ফল ও সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি বড় দুর্বলতা– পোস্ট হার্ভেস্ট লস বা ফসল কাটার পরবর্তী অপচয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফল ও সবজির ক্ষেত্রে ২৪ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় এক কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়, যার আর্থিক মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকা। এই অপচয় শুধু খাদ্যের ক্ষতি নয়, এটি কৃষকের ঘামের মূল্যহানি। উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়ছে না– এই বৈপরীত্যের মূল কারণ এখানেই। 

বর্তমানে দেশে যে কোল্ডস্টোরেজ অবকাঠামো রয়েছে, তা মূলত বড় আকারের এবং আলু সংরক্ষণকেন্দ্রিক। প্রান্তিক কৃষক বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য এসব সুবিধা কার্যত অপ্রাপ্য। ফলে অধিকাংশ কৃষক উৎপাদন মৌসুমে বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করেন। বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়, দাম পড়ে যায়; আবার অফ-সিজনে দাম বেড়ে যায়, এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।
বিশ্বের উন্নত কৃষি ব্যবস্থায় এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে ‘কোল্ড চেইন সিস্টেম’ গড়ে তুলে। সেখানে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ– ফসল সংগ্রহ, গ্রেডিং, সোর্টিং, প্যাকেজিং, প্রি-কুলিং এবং কোল্ড স্টোরেজ সমন্বিতভাবে পরিচালিত হয়। ফলে পণ্যের গুণগত মান বজায় থাকে, অপচয় কমে এবং কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হন। বাংলাদেশেও এখন এই ধরনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থার সময় এসেছে। বিশেষ করে সবজি ও ফল সংগ্রহের কনটেইনারভিত্তিক মিনি কোল্ডস্টোরেজ এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে। ২০ ফুট কনটেইনার ব্যবহার করে তৈরি এই ইউনিটগুলো দ্রুত স্থাপনযোগ্য, স্থানান্তরযোগ্য এবং তুলনামূলক কম খরচে পরিচালনাযোগ্য। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং সোলার-সহায়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো গ্রামীণ পর্যায়েও সহজে পরিচালনা করা সম্ভব।
তবে শুধু কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করলেই সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে একটি সমন্বিত ভ্যালু চেইন যেখানে থাকবে স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, মানভিত্তিক গ্রেডিং ও সোর্টিং, উন্নত প্যাকেজিং, প্রি-কুলিং এবং বাজার সংযোগ। এতে করে কৃষিপণ্য সরাসরি বাজারে না গিয়ে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে, যার ফলে তার গুণগত মান ও বাজারমূল্য উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। 
এই মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি গ্রামে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারে। প্রতিটি মিনি কোল্ডস্টোরেজ ইউনিট একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হতে পারে, যেখানে স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পারবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।

এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে সরকারের উদ্যান ফসলভিত্তিক বিদ্যমান উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করা। যেহেতু এসব কর্মসূচি ইতোমধ্যে উৎপাদন বৃদ্ধি, মানসম্পন্ন চারা সরবরাহ এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে, তাই এর  সঙ্গে সংরক্ষণ ও ফসল সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা যুক্ত করা হলে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্রোডাকশন টু মার্কেট ভ্যালু চেইন’ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নতুন প্রকল্প গ্রহণের সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া এড়িয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কৃষিতে আমরা প্রায়ই উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলি। কিন্তু উৎপাদনের পর যে ক্ষতি হয়, তা কমাতে পারলে নতুন জমি বা অতিরিক্ত ইনপুট ছাড়াই সমপরিমাণ অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা সম্ভব। আজ সময় এসেছে উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার। সমন্বিত কোল্ড চেইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, অপচয় কমবে এবং দেশের কৃষি খাত আরও টেকসই ও লাভজনক হয়ে উঠবে। কৃষকের ঘামের মূল্য দিতে ফসলের মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে নতুনভাবে ভাবার সময় এখনই।
বাংলাদেশ এখন শুধু খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথাই বলছে না, বরং কৃষিকে লাভজনক ও রপ্তানিমুখী খাতে রূপান্তরের দিকেও এগোচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন মানসম্পন্ন, নিরাপদ এবং দীর্ঘ সময় সংরক্ষণযোগ্য কৃষিপণ্য। বর্তমানে অনেক সময় কৃষকের উৎপাদিত ভালোমানের ফল ও সবজি সঠিক সংগ্রহ, প্যাকেজিং ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের অভাবে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় অথবা বাজারমূল্য হারায়। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনাও সীমিত হয়ে পড়ে। একটি কার্যকর কোল্ড চেইন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষিপণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, সুপারশপ, প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রবেশ করতে পারবে।
লেখক: প্রকল্প পরিচালক, টিস্যুকালচার ও হর্টিকালচার উন্নয়ন প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

আরও পড়ুন

×