ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের বড় লক্ষ্য বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

সৌরবিদ্যুৎ প্রসারের বড় লক্ষ্য বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
×
×

ফাইল ছবি

হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৬ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় সৌরবিদ্যুতের প্রসারে উদাহরণ ছিল বাংলাদেশ। বিদ্যুৎবিহীন প্রত্যন্ত এলাকার লাখ লাখ পরিবারকে সৌর প্যানেলের আলোয় আনে অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)। সহজ অর্থায়ন ও কিস্তিতে সৌরব্যবস্থা কেনার সুযোগ এর প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু নানা কারণে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের গতি কমে যায়। এখন বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে আবারও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। 

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে পাঁচ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং জমিতে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে আরও চার হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। তবে বিনিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, গ্রিডে সংযোগ ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে না পারলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত সক্ষমতা এক হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট। সব ধরনের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ মিলিয়ে সক্ষমতা এক হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। তবে স্থাপিত সক্ষমতা আর প্রকৃত উৎপাদন এক নয়। সূর্যের আলো, আবহাওয়া, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা ও গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগের ওপর উৎপাদন নির্ভর করে।
জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এমবারের  হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১৫৭ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুতের অংশ প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ সক্ষমতা বাড়লেও জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে সৌরবিদ্যুতের অবদান এখনও সীমিত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, সারাবিশ্ব এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বরং আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে এগিয়ে গেলে আমরা বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি এড়াতে পারব। এটা দূষণমুক্ত একটা পদ্ধতি। আমাদের দেশে সূর্যের তাপ অনেক বেশি। তাই সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও অনেক বেশি।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বড় ভূমিকা রেখেছিল ইডকলের সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল জাতীয় গ্রিডের বাইরে থাকা প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোকে বিদ্যুতের সুবিধা দেওয়া। ইডকলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এ কর্মসূচিতে প্রায় ৪১ লাখ ৩০ হাজার সৌর হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষ সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পান। আগে এসব পরিবারের অনেকে আলো জ্বালাতে কেরোসিনের বাতি ব্যবহার করতেন।

সাফল্যের পেছনে ছিল সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা। ইডকল উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ ও অনুদান নিয়ে অংশীদার সংস্থাগুলোকে অর্থায়ন করত। এসব সংস্থা গ্রাহকদের কিস্তিতে সৌরব্যবস্থা কেনার সুযোগ দিত। পাশাপাশি প্যানেল স্থাপন ও বিক্রয়োত্তর সেবা দিত। ফলে এককালীন পুরো ব্যয় বহন না করেও অনেক পরিবারের পক্ষে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
পরে কর্মসূচির গতি কমে যায়। ২০১৩ সালে এ কর্মসূচিতে আট লাখ ৬১ হাজারের বেশি সৌর হোম সিস্টেম স্থাপন করা হয়। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা নেমে আসে মাত্র তিন হাজার ৪৫৫টিতে। গবেষণায় এ পতনের কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। জাতীয় গ্রিডের সম্প্রসারণের ফলে অনেক এলাকায় সৌর হোম সিস্টেমের প্রয়োজন কমে যায়। কোথাও বিনা মূল্যে সৌরব্যবস্থা বিতরণও কিস্তিতে কেনার কর্মসূচির সঙ্গে প্রতিযোগিতা তৈরি করে। পাশাপাশি গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সমস্যা ও অর্থায়নের ধরন বদলে যাওয়াও কর্মসূচির ওপর প্রভাব ফেলে। ইডকলের এ অভিজ্ঞতা দেখায়, সৌরবিদ্যুতের প্রসারে শুধু প্রযুক্তি বা অর্থায়ন নয়, বাজারের চাহিদা ও গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। 

ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিং
জমির স্বল্পতার কারণে বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে উপযুক্ত জায়গা পাওয়া কঠিন। তাই বাড়ি, কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এসব স্থাপনায় উৎপাদিত বিদ্যুতের বড় অংশ নিজস্ব কাজে ব্যবহার করা যায়। চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে নেট মিটারিং নির্দেশিকা চালু হয়। পরে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও প্রক্রিয়া সহজ করতে ২০২৫ সালে নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। স্রেডার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হিসাবে, ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার আওতায় এক হাজার ৯৪১টি নেট মিটারিং স্থাপনার মোট সক্ষমতা ৮৪ দশমিক ৫৯২ মেগাওয়াট-পিক। এ হিসাব নেট মিটারিংয়ের আওতায় থাকা স্থাপনাগুলোর; দেশের সব ছাদভিত্তিক সৌরব্যবস্থার নয়।

নেট মিটারিংয়ে গ্রাহক দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে নিজের চাহিদা মেটান। বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করলে নির্ধারিত নিয়মে তার হিসাব বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। এতে গ্রাহকের বিদ্যুৎ খরচ কমে এবং উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎও কাজে লাগে। তবে অনুমোদন ও গ্রিডে সংযোগ পেতে দেরি হলে এ ব্যবস্থার প্রসার বাধাগ্রস্ত হয়।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। স্রেডার হিসাবে, ২০২৬ সালের জুনে দেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ছিল ৪১৮ দশমিক ১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের হিসাবে, সরকারি পরিসংখ্যানে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত না হওয়া স্থাপনাগুলো ধরলে এ সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ২৩৯টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ছাদেই ৬৬৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরব্যবস্থা রয়েছে। দুই হিসাবের আওতা এক নয় বলে পার্থক্যটি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বাড়াতে সরকার বিশেষ প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে। নির্ধারিত শর্তে ব্যাটারিসহ সৌরব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ সুবিধার যোগ্যতা, সময়সীমা ও অন্যান্য শর্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে এককালীন বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি কেনার খরচ অনেক পরিবার, ছোট ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাধা। এ ক্ষেত্রে ইডকলের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করে। একটি ব্যবস্থায় ভবন মালিক নিজে বিনিয়োগ করেন; অন্য ব্যবস্থায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ছাদ ভাড়া নিয়ে সৌরব্যবস্থা স্থাপন করে এবং চুক্তি অনুযায়ী ভবন মালিককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সহজ শর্তে ঋণ, কার্যকর চুক্তি ও নির্ভরযোগ্য রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।

বড় প্রকল্পে ধীরগতি
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ২৬টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে এক হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট সক্ষমতা যোগ হওয়ার কথা। এর মধ্যে সরকারি ছয়টি প্রকল্পের সক্ষমতা ১১২ মেগাওয়াট এবং বেসরকারি ২০টি প্রকল্পের এক হাজার ৬২ মেগাওয়াট। তবে পরিকল্পনায় থাকা সক্ষমতা আর বাস্তবে চালু হওয়া সক্ষমতা এক নয়। প্রকল্পের নির্মাণ শেষ করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে না পারলে নির্ধারিত সময়ে সেখান থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না।
জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ অর্থ পরিশোধ ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ঠিকাদারের বকেয়া বিল এবং প্রকল্পের কাজের পরিধি নিয়ে সমস্যা থাকায় নির্মাণকাজে গতি আসেনি। প্রকল্পটি শেষ করতে এসব জটিলতা কাটানো প্রয়োজন।
বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প গত ৭ অক্টোবর একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৪৯৮ কোটি আট লাখ টাকা। আগে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যাটারি ব্যবস্থা যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেও নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব নয়।

রক্ষণাবেক্ষণে নজর দরকার
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্যানেল বসানোই শেষ কথা নয়। দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন ধরে রাখতে নিয়মিত প্যানেল পরিষ্কার, যন্ত্রপাতি পরীক্ষা, ইনভার্টার মেরামত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। এসব কাজের জন্য দক্ষ জনবল ও নির্দিষ্ট বাজেট প্রয়োজন। রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি হলে প্যানেল অক্ষত থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে।
প্রকল্প অনুমোদনের সময়ই দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন ও ব্যয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসালে মালিকানা, মেরামত ও ব্যয় বহন নিয়ে 
বিরোধ এড়াতে আগেই চুক্তি করতে হবে। সরকারি ভবন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরব্যবস্থা বসানোর ক্ষেত্রেও নিয়মিত দেখভালের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুৎ দিনের আলোয় বেশি উৎপাদিত হয়, কিন্তু সন্ধ্যায় চাহিদা বাড়ার সময় উৎপাদন কমে যায়। এ ব্যবধান সামলাতে সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে ব্যাটারি ব্যবহারে প্রাথমিক ব্যয় বাড়ে। তাই কোথায় কতটা সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন, তা হিসাব করেই বিনিয়োগ করা উচিত।

আরও পড়ুন

×