জেনে রাখুন
ডেভেলপারকে জমি-বাড়ি দিলে রিটার্নে আয় দেখাবেন যেভাবে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:১৫ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
শহরাঞ্চলে নিজের ফাঁকা জমি বা পুরোনো বাড়ি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ নেন অনেকে। একটি বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শেষ হতে অন্তত তিন বছর লাগে। চুক্তি করে প্রথম বছরে সাইনিং মানি ও বাড়ি ভাড়া পাওয়া, দ্বিতীয় বছরের বাড়ি ভাড়া ও তৃতীয় বছরে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়াসহ পুরো প্রক্রিয়ায় কোন আয়বর্ষে আয়কর রিটার্নের কোন অংশে কীভাবে আয় দেখাতে হবে এবং কীভাবে কর পরিশোধ করতে হবে, তা নিয়ে অনেক জমির মালিকই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকেন। বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে এনবিআরের ওয়েবসাইটে দেওয়া নতুন আয়কর পরিপত্রে।
আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী, ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত নগদ সাইনিং মানি, বাড়ি ভাড়া বা নির্মিত ফ্ল্যাট কোনোটিই সাধারণ ব্যবসা বা গৃহসম্পত্তির আয় নয়। এসব আয় মূলধনি মুনাফা। রিটার্নে মূলধনি মুনাফা অংশে তা দেখাতে হয়।
একটি তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের উদাহরণ বিবেচনা করলে বিষয়টি একদম পরিষ্কার হবে। ধরা যাক, একজন করদাতার জমি বা নিজে বানানো বাড়ির নির্মাণ বাবদ মোট প্রকৃত বিনিয়োগ বা অর্জন মূল্য ছিল ৬০ লাখ টাকা। তিনি ২০২৫-২৬ আয়বর্ষে একজন ডেভেলপারের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তি করেন। ভবন নির্মাণে মোট তিন বছর সময় নির্ধারিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম আয়বর্ষে তিনি এক কোটি টাকা নগদ সাইনিং মানি পান। একই সঙ্গে কাজ চলাকালীন অস্থায়ী আবাসন বাবদ ওই বছর কয়েক মাসের বাড়ি ভাড়া হিসেবে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা পান। এ ক্ষেত্রে ২০২৫-২৬ আয়বর্ষের রিটার্নে জমির মালিককে মূলধনি মুনাফা অংশে প্রাপ্ত সাইনিং মানি ও বাড়ি ভাড়ার সুবিধা প্রদর্শন করতে হবে। ডেভেলপার এক কোটি টাকা সাইনিং মানি দেওয়ার সময় উৎসে ১৫ শতাংশ হারে ১৫ লাখ টাকা কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেয়। এ ছাড়া বাড়ি ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত তিন লাখ ৬০ হাজার টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে অর্জিত ৫৪ হাজার টাকা মূলধনি মুনাফা কর হিসেবে ওই বছর জমা দিতে হয়। রিটার্নের উৎসে কাটা কর ও অগ্রিম কর অংশে এই ১৫ লাখ টাকা এবং ৫৪ হাজার টাকা জমার প্রমাণপত্র যুক্ত করতে হয়। এরপর অন্য আয় থাকলে তার সঙ্গে যোগ হয়ে প্রযোজ্য কর ধাপ অনুযায়ী কর হিসাব করতে হয়। চূড়ান্ত করদায়ের সঙ্গে ডেভেলপার যে উৎসে কর কেটে নিয়েছে, তার প্রমাণপত্র থাকলে কর প্রদানের সময় তা সমন্বয় করা যায়।
এরপর ২০২৬-২৭ আয়বর্ষে ভবন নির্মাণের কাজ চলমান থাকে। এ বছরে জমির মালিক কোনো সাইনিং মানি বা ফ্ল্যাট পান না। তবে চুক্তি অনুযায়ী ডেভেলপার কোম্পানি থেকে বাড়ি ভাড়া সুবিধা বাবদ আরও তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা পান। ফলে ২০২৬-২৭ আয়বর্ষের আয়কর রিটার্নেও আগের মতই মূলধনি মুনাফা অংশে এই প্রাপ্ত তিন লাখ ৬০ হাজার টাকার বাড়ি ভাড়া সুবিধা প্রদর্শন করতে হবে। এই আয়ের ওপর নির্ধারিত ১৫ শতাংশ হারে ৫৪ হাজার টাকা, যা ডেভেলপার উৎসে কেটে নিয়েছেন তার প্রমাণপত্র নিয়ে মূলধনি মুনাফা কর হিসেবে রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হবে। এই বছরে পরিশোধ করা ৫৪ হাজার টাকার কর জমার প্রমাণপত্রও রিটার্নে সংরক্ষণ করা হয়।
২০২৭-২৮ আয়বর্ষে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী জমির মালিক তাঁর কাঙ্ক্ষিত চারটি ফ্ল্যাট বুঝে পান। অনুমান করি, ওই চারটি ফ্ল্যাটের তৎকালীন মোট বাজারমূল্য দুই কোটি টাকা। এই তৃতীয় আয়বর্ষটি হলো করদাতার জন্য চূড়ান্ত হিসাব ও কর নিষ্পত্তির বছর।
২০২৮-২৯ করবর্ষের রিটার্ন দাখিলের সময় জমির মালিককে পুরো প্রজেক্টের সামগ্রিক হিসাব মূলধনি মুনাফা অংশে উপস্থাপন করতে হবে। এখানে তিনি প্রথম বছরের এক কোটি টাকা সাইনিং মানি, দুই বছরে প্রাপ্ত মোট সাত লাখ ২০ হাজার টাকার বাড়ি ভাড়া এবং তৃতীয় বছরে প্রাপ্ত দুই কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাটসহ মোট তিন কোটি সাত লাখ ২০ হাজার টাকার সুবিধা প্রদর্শন করবেন। এই মোট প্রাপ্ত সুবিধা থেকে জমির আসল অর্জন মূল্য ৬০ লাখ টাকা বিয়োগ করা হবে। ফলে তার নিট করযোগ্য মূলধনি মুনাফা দাঁড়াবে দুই কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার টাকা।
এই নিট মূলধনি মুনাফার ওপর ১৫ শতাংশ হারে মোট প্রদেয় করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৭ লাখ আট হাজার টাকা। করদাতার চূড়ান্ত প্রদেয় কর বের করতে আগের পরিশোধিত কর বাদ দেওয়া হয়। প্রথম বছরে সাইনিং মানি থেকে উৎসে কাটা ১৫ লাখ টাকা এবং দুই বছরে বাড়ি ভাড়ার ওপর পরিশোধিত মোট এক লাখ আট হাজার টাকা সমন্বয় করা হলে তার অবশিষ্ট নিট প্রদেয় কর দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকা।
আইনে এই ২১ লাখ টাকা কর পরিশোধের জন্য নমনীয় সুবিধা রয়েছে। করদাতা ২০২৭-২৮ আয়বর্ষের রিটার্ন দাখিলের সময় চাইলে এই ২১ লাখ টাকা এককালীন জমা দিতে পারেন। আর একবারে দিতে না চাইলে তিনি ২০২৭-২৮, ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ আয়বর্ষের রিটার্নে তিনটি সমান বার্ষিক কিস্তিতে অর্থাৎ প্রতিবছর সাত লাখ টাকা করে পরিশোধ করতে পারেন।
- বিষয় :
- আয়কর