অভিমত
সুতা নিয়ে টানাটানিতে ক্ষতিটা দু’পক্ষেরই
মহিউদ্দিন রুবেল
মহিউদ্দিন রুবেল
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেশি টানলে সুতা ছিঁড়ে যায়, এ কথা যেকোনো তাঁতি জানেন। বস্ত্রকল আর পোশাক কারখানা একই সুতার দুই প্রান্ত। দুই পক্ষেরই যুক্তি আছে, দুই পক্ষই দেশের কর্মসংস্থানের কথা বলছে। কিন্তু টানাটানি যত দীর্ঘ হচ্ছে, রপ্তানিকারকের খরচ আর অনিশ্চয়তাও তত বাড়ছে। সুতা ছেঁড়ার আগেই দুই প্রান্তকে মেলানোর সময় এখন। তবে তার আগে দেখা দরকার, দেশের মিল কি সব ধরনের সুতার চাহিদা মেটাতে পারে?
গত বছরের মে মাসে লিখেছিলাম, স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিতে অনিয়ম থাকলে অনিয়ম বন্ধ করতে হবে, আমদানির পথ নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সতর্ক করেছিলাম, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে নিলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে নিট পোশাক খাত। দুই লেখাতেই বলেছিলাম, বড় কাঠামোগত সিদ্ধান্তের আগে সব পক্ষকে নিয়ে প্রভাব বিশ্লেষণ দরকার। ৯ মাসে সেই বিশ্লেষণ হয়নি, সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। বন্ড সুবিধায় রপ্তানিমুখী কারখানা শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আনতে পারে, শর্ত হলো তা দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানি করতে হবে। চার দশকে পোশাকশিল্পের অগ্রগতিতে এই সুবিধার বড় ভূমিকা আছে।
গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ডসুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ করে। ২০ আগস্ট বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর এনবিআর আদেশ দেয়, এই সুতা আনতে শুল্ক-করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি লাগবে। ১৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যাংক গ্যারান্টির শর্ত তুলে নিতে চিঠি দেয়। কিন্তু কাস্টমস জানায়, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা পায়নি, ফলে বন্দরে সুতা খালাস আটকে থাকে। ৮ অক্টোবর এনবিআর আদেশটি সংশোধন করে জানায়, ৭ সেপ্টেম্বরের আগে খোলা ঋণপত্রের সুতা ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়াই খালাস হবে, তবে এর পরে খোলা ঋণপত্রে গ্যারান্টি লাগবে। সেদিন থেকে কাস্টমস পুরোনো ঋণপত্রের সুতা ছাড়তে শুরু করে। অর্থাৎ প্রায় এক মাস আটকে থাকা পুরোনো চালান ছাড়া পেয়েছে, কিন্তু নতুন ঋণপত্রে গ্যারান্টির শর্ত বহাল আছে। ১৫ অক্টোবর বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ প্রধানমন্ত্রীর কাছে আদেশ প্রত্যাহার চায়। তিন দিন পর বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ আদেশ বহাল রাখার দাবি জানায়। ২৯ অক্টোবরের আরেক আদেশে স্পষ্ট করা হয়, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা বলতে সিঙ্গেল কাউন্টের সুতা বোঝাবে।
বিটিএমএর যুক্তি কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন, যা সরকারেরও লক্ষ্য। বন্ধ স্পিনিং মিল চালু হলে কাজ বাড়বে, এটা সত্য। নিট কারখানার লাখো শ্রমিকের কাজ টিকিয়ে রাখাও একই লক্ষ্যের অংশ। দুটো একসঙ্গে পেতে হলে উদ্যোক্তার পথের জট কমাতে হয়। বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা এই টানাপোড়েন দেখছেন, আর তাদের কাছে নিয়মের স্থিরতা জরুরি। পোশাক মালিকদের দাবি, কিছু ক্রেতা এরই মধ্যে ভারত ও মিসরে ক্রয়াদেশ সরাচ্ছেন। বিটিএমএ এর তথ্যভিত্তিক যাচাই চায়। যাচাই হোক। তবে নিয়ম নিয়ে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা যে ভাবমূর্তির ক্ষতি করে, তা বলতে যাচাই লাগে না।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ কাউন্টের কটন সুতার কেজিপ্রতি দাম ৩ ডলার ১৫ থেকে ২০ সেন্ট থেকে বেড়ে ৩ ডলার ৩০ থেকে ৪০ সেন্ট হয়েছে, মাঝে সাড়ে ৩ ডলারেও উঠেছিল। একটি কম্পোজিট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, তাদের সুতা বিক্রি প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ দেশি মিল বাড়তি ব্যবসা পাচ্ছে, পোশাক কারখানা দিচ্ছে বাড়তি দাম। সুরক্ষার উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় মিলকে টিকিয়ে রাখা, দাম বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া নয়। এখানে তদারকি দরকার।
আদেশে সুতা ভাগ করা হয়েছে কাউন্ট দিয়ে, মান বা ধরন দিয়ে নয়। ২৯ অক্টোবরের ব্যাখ্যায় সিঙ্গেল কাউন্টে সীমিত হওয়ায় ফ্লাই সুতা ব্যবহারকারী সোয়েটার ও কিছু ওভেন কারখানা খানিকটা স্বস্তি পাবে। কিন্তু টি-শার্ট, পোলো শার্ট বা নিট ট্রাউজারের মূল সুতাই সিঙ্গেল কাউন্টের, তাই সবচেয়ে বড় চাপ যেখানে ছিল, সেখানেই আছে। একই সিঙ্গেল কাউন্টে অর্গানিক বা সনদপ্রাপ্ত, স্লাব কিংবা ক্রেতার মনোনীত সুতা আছে, যা দেশি মিল সব সময় প্রয়োজনমতো ও সময়মতো দিতে পারে না। বিটিএমএর হিসাবেই স্থানীয় বস্ত্রকল নিট পোশাকের ৮০ শতাংশ ও ওভেন পোশাকের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতা সরবরাহ করে; যদিও নিট মালিকদের দাবি তা ৬০ এর বেশি নয়। ডেনিম মিলেও এই কাউন্টের সিঙ্গেল সুতা লাগে, তাদেরও একই শর্তে বাঁধা হয়েছে। দেশে প্রয়োজনমতো মেলে না বা ক্রেতা নির্দিষ্ট উৎস চান, এমন সুতা ক্রেতার কাগজপত্র দেখিয়ে বন্ডে আনার সুযোগ থাকা উচিত।
বিটিএমএর আরেক যুক্তি, বন্ডে আনা সুতা স্থানীয় বাজারে চলে যায় এবং দেশীয় মিলকে অসম প্রতিযোগিতায় ফেলে। এই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু সমস্যা অপব্যবহার হলে সমাধান অপব্যবহার ঠেকানো, পুরো সুবিধা বন্ধ করা নয়। অসুখ হলে অসুখের চিকিৎসা করতে হয়।
সব সুতা রপ্তানি পোশাকে সমানভাবে লাগে না। কিছু সুতা মূলত স্থানীয় বাজারের কাপড়, লুঙ্গি, গামছা বা দেশি পোশাকে লাগে, আর বন্ডের বাইরে বিক্রির ঝুঁকিও এগুলোতেই বেশি। তাই ক্রয়াদেশ, ইইউডি ও রপ্তানির তথ্য মিলিয়ে চিহ্নিত করা হোক কোন সুতা রপ্তানিতে নিয়মিত লাগে, প্রয়োজনে সেগুলো বন্ডে থাকুক। যেগুলো রপ্তানিতে কম লাগে আর স্থানীয় বাজারে সহজে বিক্রি হয়, সেগুলো বন্ডের বাইরে বা কড়া নজরদারিতে আসুক। আমদানি, প্রাপ্যতা, ব্যবহার ও রপ্তানি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেলানো হোক, যাতে আমদানির অনুপাতে রপ্তানি না হলে ধরা পড়ে। দোষী প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স বাতিল হোক। গুটিকয়েক অনিয়মের দায় সৎ রপ্তানিকারকের ঘাড়ে চাপানো ন্যায্য নয়। নীতির প্রশ্নে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দরকার, সঙ্গে নিশ্চয়তা যে তা অন্তত এক বছর বদলাবে না। স্পিনিং মিলের আসল সমস্যা গ্যাস-সংকট ও উচ্চ সুদহার, এর সমাধানে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর মূল্য সংযোজনের লক্ষ্য ধাপে ধাপে ঘোষিত সময়সূচিতে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে কারখানা ও ক্রেতা পরিকল্পনা করতে পারে।
মহিউদ্দিন রুবেল: প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস এবং সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ
- বিষয় :
- সমৃদ্ধি