সাক্ষাৎকার
সিমেন্ট খাতকে উচ্চ শুল্ক-করের বোঝা বহন করতে হচ্ছে
মোহাম্মদ আমিরুল হক সভাপতি, বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ)
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকাল: সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প ও বেসরকারি আবাসন খাতে মন্থর গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সিমেন্ট প্রস্তুতকারকরা কী ধরনের বিপণন কৌশল অনুসরণ করছেন?
মোহাম্মদ আমিরুল হক: বর্তমান পরিস্থিতিতে সিমেন্ট প্রস্তুতকারকরা অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছেন। তারা তাদের উৎপাদন সক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছেন না। কিছু সিমেন্ট প্রস্তুতকারক কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। এর মধ্যেও গ্রামীণ চাহিদা থেকে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ভিত্তি করে গ্রামীণ পর্যায়ে চাহিদার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
সমকাল: ডলারের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ও এলসি খোলা নিয়ে সিমেন্ট প্রস্তুতকারকদের কি কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে?
মোহাম্মদ আমিরুল হক: পুরোপুরি আমদানিনির্ভর খাত হওয়ায় সিমেন্ট প্রস্তুতকারকরা এ সম্পর্কিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে, যখন ডলারের দাম হঠাৎ করে ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ৯৮ টাকায় পৌঁছাতে শুরু করে। একদিকে নতুন এলসি খোলার সমস্যা আর অন্যদিকে বকেয়া বা ডিফার্ড এলসি পরিশোধের গুরুতর সংকটের মুখে পড়তে হয় সিমেন্ট নির্মাতাদের। সিমেন্ট খাতে এ ধরনের তারল্য সংকট এখনও বিদ্যমান।
সমকাল: আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিংকার ও জ্বালানি দামের ওঠানামা এবং সমুদ্রপথে ফ্রেইট চার্জ বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সিমেন্ট খাত কীভাবে তাদের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করছে?
মোহাম্মদ আমিরুল হক: অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে সৃষ্ট প্রাইস ওয়ারের কারণে কিছু সিমেন্ট নির্মাতা অতিরিক্ত খরচ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন।
সমকাল: ক্লিংকার, স্লাগ, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ এবং জিপসামের মতো কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক-কর এবং অগ্রিম আয়কর উৎপাদন খরচে কি কোনো প্রভাব ফেলছে? এ বিষয়ে এনবিআরের কাছে আপনাদের দাবিগুলো কী কী?
মোহাম্মদ আমিরুল হক: সিমেন্ট একটি নির্মাণসামগ্রী। দেশের উন্নয়নে অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও এ খাতকে উচ্চ শুল্ক ও করের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের বেশ কিছু দাবি রয়েছে। এর একটি হচ্ছে ক্লিংকারের ওপর কাস্টমস ডিউটি বা সিডি সম্পর্কিত। বর্তমানে আমরা অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুর ওপর ১৫ শতাংশ হারে সিডি দিচ্ছি। এর পরিবর্তে আমরা প্রতি টন ক্লিংকারে নির্দিষ্টভাবে ৫০০ টাকা কাস্টমস ডিউটি চাই। চুনাপাথরে বর্তমানে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুর ওপর ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক দেওয়া হচ্ছে। আমরা এই শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি চাই। কারণ চুনাপাথর হলো সিমেন্ট উৎপাদনের কাঁচামাল।
বর্তমানে আমদানি পর্যায়ে ক্লিংকার, স্লাগ, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসাম–এই পাঁচটি কাঁচামালের ওপর ২ থেকে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বা এআইটি দিতে হয়। এর পরিবর্তে আমদানি পর্যায়ে আমরা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ এআইটি চাই। একইভাবে বিক্রির পর্যায়েও ২ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ এআইটি চাই। আমদানি পর্যায়ে পাঁচটি কাঁচামালের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুর ওপর শুল্ক ও কর আদায় করা হয়। এর পরিবর্তে প্রকৃত ইনভয়েস মূল্যের ওপর শুল্ক ও কর আদায়ের দাবি জানাচ্ছি।
সমকাল: এ খাতের ভ্যাট ও করপোরেট কর নিয়ে আপনাদের কোনো প্রস্তাবনা রয়েছে?
মোহাম্মদ আমিরুল হক: বর্তমানে বিভিন্ন হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়। এর পরিবর্তে আমরা এমএস রডের মতো একটি সুনির্দিষ্ট ভ্যাট ট্যারিফ পদ্ধতি চাই। অর্থাৎ দেশের সব প্রস্তুতকারকের জন্য প্রতি ব্যাগে একটি নির্দিষ্ট একক ভ্যাট হার থাকা উচিত। আমাদের ধারণা, এতে সিমেন্ট খাত থেকে বর্তমানের চেয়ে মোট ভ্যাট সংগ্রহ বেশি হবে এবং ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতাও অনেকাংশে কমে যাবে। পাশাপাশি দেশের উন্নয়নমূলক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় করপোরেট করও যুক্তিসংগত হারে কমানো যেতে পারে। এ ছাড়া সিমেন্ট রপ্তানির ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা বা ক্যাশ ইনসেনটিভ চালু করা যেতে পারে।
সমকাল: সরকারের কাছে সার্বিকভাবে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
মোহাম্মদ আমিরুল হক: সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের সরকারের রেখে যাওয়া ব্যাংক খাতের সমস্যা ও অর্থনৈতিক সংকটের কাঠামোগতভাবে সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতও এক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা আসার ওপর এসবের উত্তরণ অনেকাংশে নির্ভর করছে। সরকারি বড় বড় অবকাঠামোসহ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনেক প্রকল্পের কাজ নতুন সরকার আসার পর এখনও পুরোপুরি গতিশীল বা যুক্ত হয়নি। বর্তমান জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে যখন সরকারি অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক কাজগুলো পুরোদমে শুরু হবে তখন নির্মাণসামগ্রী যেমন সিমেন্ট, রড ও অন্যান্য উপকরণের চাহিদা ও বাজার স্বাভাবিকভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন বাদল
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার