সিমেন্ট শিল্পে মন্দাবস্থার পেছনে আবাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি
জসিম উদ্দিন বাদল
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে সিমেন্ট শিল্প বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। সরকারি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ধীরগতি, আবাসন খাতে স্থবিরতা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যক্তিপর্যায়ে গৃহনির্মাণ কমে যাওয়ায় সিমেন্টের সামগ্রিক চাহিদা কমেছে। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে এ খাতে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ উন্নয়নশীল দেশে হওয়ার পর্যায়ে থাকা বাংলাদেশের এ ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৫ প্রবৃদ্ধি হওয়া উচিত বলে মনে করেন উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সিমেন্ট শিল্পে এখন মোটেই ভালো সময় যাচ্ছে না। জাহাজ ভাড়া ও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ শুল্ককর এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়ের চাপে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও এ শিল্পের বেশির ভাগ কারখানা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতায় চলছে। উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক সিমেন্ট অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। এতে পরিচালন মূলধন সংকট দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সিমেন্ট উৎপাদনকারীদের দাবি, সুদহার কমিয়ে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার প্রক্রিয়া সহজ ও ব্যাংকে পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে হবে। উচ্চ শুল্ককর কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে। পরিবেশ রক্ষা ও চাহিদা বাড়ানোর জন্য পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার কমিয়ে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হলো-ব্লক ব্যবহারে আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০১ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে শুধু এক ধরনের তথা সাধারণ পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট সিমেন্ট পাওয়া যেত। এরপর থেকে বিভিন্ন ধরনের সিমেন্টের উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে পোর্টল্যান্ড ফ্লাই অ্যাশ সিমেন্ট, পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট ও হোয়াইট পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট পাওয়া যাচ্ছে। ব্র্যান্ডভেদে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট বিক্রি হচ্ছে ৪৮৫ থেকে ৬৯০ টাকা দরে। বাজারে শাহ, সেভেন রিং, হোলসিম, প্রিমিয়ার, স্ক্যান, বসুন্ধরা, ফ্রেস, বেঙ্গলসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিমেন্ট রয়েছে।
আবাসন খাতে মন্দাবস্থা ও এডিপির বাস্তবায়ন কম
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, তাদের অনেকের রেডি ফ্ল্যাট অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে অনেকেই নতুন করে প্রকল্প নেওয়া স্থগিত রাখছে। রিহ্যাবের তথ্যমতে, ফ্ল্যাটের বিক্রি বছরের ব্যবধানে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কমেছে। আবাসন খাতের নিঃশ্বাস এখন নাগের ডগায়, কারণ আয় না বাড়লে মানুষ আবাসনের চিন্তা করে না– এমন মন্তব্য রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাবেক পরিচালক ও ঐশী প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান আইয়ূব আলীর। সমকালকে তিনি বলেন, ক্রেতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। কিছু ক্রেতা এলেও তারা উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে ফ্ল্যাট কিনতে চায়। কিন্তু লোকসান দিয়ে তো বিক্রি সম্ভব নয়। এক বছর আগে পান্থপথে একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করার পর ক্রেতা সেটি ফেরত নেওয়া অথবা বিক্রি করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর ১৪০ ফ্ল্যাট অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে উল্লেখ করে এই আবাসন ব্যবসায়ী জানান, বসুন্ধরায় তিনি ১০ বিঘা জমিতে ছয়টি প্রকল্প করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ইতোমধ্যে নির্মিত ফ্ল্যাটগুলো বিক্রি করতে না পরায় তিনি নতুন প্রকল্পে হাত দিচ্ছেন না।
এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। এডিপি বাস্তবায়নের এই হার এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল খুবই কম। বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
আবাসন খাত ও এডিপি বাস্তবায়নের এই চিত্রই বলে দিচ্ছে সিমেন্টের চাহিদা কমেছে। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ও উদ্যোক্তারা বলছেন, বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে যুদ্ধ ও ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে কাঁচামালের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। যেমন, এক-দেড় বছর আগে যে ক্লিংকারের দাম টনপ্রতি ৪২ ডলার ছিল, তা বেড়ে এখন ৬৩ থেকে ৬৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ক্লিংকারের দাম প্রতি টন প্রায় ৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ৫৭-৫৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং স্লাগের দাম প্রতি টন ১৬ ডলার থেকে বেড়ে ২৩-২৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইভাবে জ্বালানি তেল ও অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলের দাম বাড়ার ফলে জাহাজ ভাড়া ১২ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ৩০ হাজার ডলারে উঠেছে। এতে সব ধরনের কাঁচামালের দাম ৫০ শতাংশের মতো বেড়েছে, যা স্থানীয় বাজারেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
মেট্রোসেম সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল্লাহ সমকালকে বলেন, আবাসন খাতের স্থবিরতার কারণে সিমেন্ট এবং রডের চাহিদা ও বিক্রি কমেছে। শীর্ষস্থানীয় কিছু উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে, যদিও তারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছেন না। তবে সার্বিকভাবে খাতটি ধীরগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ডলারের দাম বাড়ার কারণেও লোকসানের মুখে পড়তে হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের চলতি মূলধন সংকুচিত হয়েছে। ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মানুষের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এক ধরনের শ্লথগতি তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের সার্বিক খরচের ওপর। ফলে পুরো বাজারেই বিক্রয় কার্যক্রম নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখোমুখি হয়েছে।
বাজারের আকার
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ২০তম বৃহত্তম সিমেন্ট বাজার। এ বাজারের আকার ৪৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে ছোট, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে সক্রিয় কারখানা রয়েছে ৩৫ থেকে ৪০টি। এদের মোট বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আট কোটি টন। বার্ষিক প্রকৃত চাহিদা সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টন। চাহিদা ও প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক ভারসাম্যের কারণে বাজারের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন সক্ষমতাই অব্যবহৃত বা উদ্বৃত্ত থেকে যায়। ফলে বাজার ধরে রাখতে কোম্পানিগুলোর মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এতে মুনাফার মার্জিন কমে যাচ্ছে বলে জানান উদ্যোক্তারা। কারণ, দেশে বর্তমানে মাথাপিছু বার্ষিক সিমেন্ট ব্যবহারের পরিমাণ ২১০ থেকে ২৩০ কেজি, যেখানে বৈশ্বিক গড় ব্যবহার প্রায় ৫৫০ কেজি।
তবে দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশ এখন ভারত (বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো), নেপাল ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সিমেন্ট রপ্তানি করছে। যদিও এর পরিমাণ খুব বেশি নয়। সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, দেশে এক দিনে যে পরিমাণ সিমেন্ট ব্যবহার হয়, পুরো এক মাসেও সেই পরিমাণ সিমেন্ট রপ্তানি হয় না। মূলত লজিস্টিক বা যাতায়াত সুবিধার কারণেই এই সামান্য পরিমাণ সিমেন্ট রপ্তানি করা হয় বলে জানান তারা।
উৎপাদন ও ব্যবসায় বাধা
সিমেন্ট তৈরির প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার, যা চুনাপাথর দিয়ে তৈরি। কিন্তু দেশে এর প্রাকৃতিক উৎস নেই বললেই চলে। এ ছাড়া জিপসাম, ফ্লাই অ্যাশ, স্ল্যাগ ও লাইমস্টোন বিদেশ থেকে বিশেষ করে ভিয়েতনাম, ভারত, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আনতে হয়। সব মিলিয়ে সিমেন্ট তৈরির ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়।
কিন্তু বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলায় ব্যাঘাত বা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে আমদানি ব্যাহত হয়। অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির জন্য ডলার সংকটে ঋণপত্র খুলতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
উৎপাদনকারীরা জানান, সিমেন্ট উৎপাদন পুরোপুরি জ্বালানি ও বিদ্যুৎনির্ভর শিল্প। কিন্তু ঘন ঘন গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং লোডশেডিংয়ে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিক্রি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধীরগতি। তাদের ভাষ্য, সিমেন্ট চাহিদার বড় অংশ আসে সরকারি অবকাঠামো যেমন– সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি ও উন্নয়ন বাজেটসংক্রান্ত প্রকল্প থেকে। তবে অর্থনৈতিক মন্দায় অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছে। এ কারণে সার্বিক বিক্রি অনেক কমেছে।
বিসিএমএর তথ্যমতে, দেশে সর্বপ্রথম করোনা অতিমারির সময় ২০২০ সালে সিমেন্ট বিক্রিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়। ওই সময় বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১ শতাংশ কমে যায়। তবে পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ ব্যাপক উন্নতি ঘটে। ওই বছরে প্রায় ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। এরপর ফের কমতে শুরু করে। ২০২২ সালে ১ দশমিক ৪, ২০২৩ সালে শূন্য দশমিক ৭৪, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ২৮ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে সিমেন্ট বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অর্জন হওয়া উচিত। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী জিডিপির দেড় থেকে দুই শতাংশ প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা।
শুল্ককরের বোঝা থেকে মুক্তি চান উদ্যোক্তারা
আমদানির পর্যায়ে কাঁচামালের উচ্চ মূল্যায়ন মূল্যের ওপর শুল্ক ও কর আদায় করার বদলে প্রকৃত ইনভয়েস মূল্যের ওপর শুল্ক ও কর আদায়ের দাবি জানান এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, বর্তমানে প্রতি টন ক্লিংকারের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালুর ওপর ১৫ শতাংশ, চুনাপাথরে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক রয়েছে। এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে ক্লিংকার, স্লাগ, চুনাপাথর, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসাম– এই পাঁচটি কাঁচামালে ২ থেকে ৪ শতাংশ অগ্রিম আয়কর দিতে হয়। এ খাতের উন্নয়নে এসব করহার কমানোর আহ্বান জানান উদ্যোক্তারা।
- বিষয় :
- সিমেন্ট