পানি ও পাহাড়ের যুগলবন্দি
টাঙ্গুয়ার হাওর, সুনামগঞ্জ - মহিউদ্দিন আহমদ শাহীন
পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৩ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:০৭
হাওর ভরা বর্ষায় এক রূপ, হেমন্তে আরেক রূপ। বর্ষার রূপ উপচে পড়ছে এই সময়ে। টাঙ্গুয়ার হাওরের স্বচ্ছ জলে জলকেলি, রাতে জল-জোছনার মায়াবী খেলায় মন জুড়িয়ে যায় আগন্তুকের। শেষ বিকেলে উত্তরের সবুজ মেঘালয় পাহাড়, আকাশে থাকা মেঘের ছায়া অন্য রকম এক মায়া বিলিয়ে দেয়, মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে।
হাওরগুলোর অপরূপ সৌন্দর্য দেখার জন্য টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সুনামগঞ্জের হাওর এখন ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দ বা মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে। মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের এই জলাভূমিতে এসেই সময় কাটাতে ছুটছেন পর্যটকরা। শারদীয় দুর্গোৎসবের ছুটি, বিশ্ব পর্যটন দিবসকে সামনে রেখে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন এখানকার পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা।
হাওর, পাহাড়, নদী ও লেকের অপার সৌন্দর্য একসঙ্গে ধরা দেয় সুনামগঞ্জের সীমানায় পৌঁছলেই। টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী লেক) ঘুরে যে কেউ মুগ্ধতা নিয়ে ফেরেন। টাঙ্গুয়ার হাওরে এলে পর্যটকরা বাড়তি হিসেবে জাদুকাটা নদী, বারেকের টিলা, শিমুলবাগান ও লাকমাছড়া ঘুরে যান। পুরো এলাকা কাছাকাছি, ছবির মতো সুন্দর।
হাওর পর্যটনে গেল কয়েক বছরে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে হাউসবোট। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ টাঙ্গুয়ার হাওরে নিবন্ধিত প্রায় ১০০ হাউসবোট আছে। এর বাইরে নানা জায়গা থেকে ছোট-বড় আরও প্রায় ২০০ নৌকা ও বোট আসে টাঙ্গুয়ার হাওরে। পর্যটকরা এসব বোটে সারাদিন হাওরে ঘুরে বেড়ান, পরে বোটেই রাত যাপন করেন হাওরপারের টেকেরঘাট এলাকায়। আবার অনেক বোট সারাদিন ঘুরে পর্যটকদের নিয়ে হাওরে থেকে ফিরে আসে।
পর্যটকদের হাওরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য এখন নির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রশাসন। এর বাইরে যেতে হলে ছোট ছোট নৌকায় করে ঘুরতে হবে। এর ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে।
টাঙ্গুয়ার ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় করচগাছের বাগান রয়েছে। এখানে অনেকেই জলকেলি করেন। পর্যটকদের বেশির ভাগই এখন টেকেরঘাট এলাকায় বোটেই রাত যাপন করেন। মেঘালয় পাহাড়ের কূলঘেঁষে টেকেরঘাটে নিলাদ্রী লেকে বিকেলে ঘুরন্তির ছবি তোলে ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করেন তারা।
টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিচিতি
সুনামগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলায় এই হাওরের অবস্থান। হাওরের আয়তন ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। ছোট-বড় ১০৯টি বিল আছে। তবে প্রধান বিল ৫৪টি। হাওরের ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য খাল ও নালা। বর্ষায় সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তখন হাওর অনেকটা সমুদ্রের রূপ নেয়। হাওর এলাকায় ৮৮ গ্রাম আছে। বর্ষায় এই গ্রামগুলোকে ছোট ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়। হাওরের উত্তরে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। এই পাহাড় থেকে ৩৮টি ঝর্ণা নেমে এসে মিশেছে টাঙ্গুয়ার হাওরে।
যেভাবে আসবেন
পর্যটকবাহী সব হাউসবোটেরই ফেসবুক পেজ রয়েছে। এই পেজ থেকেই ‘হাউসবোট’ বুকিংয়ের চুক্তি সেরে নেন পর্যটকরা। এ ছাড়া ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’ লিখে সার্চ দিলেই গ্রুপ পাওয়া যায়। সেখানেও হাউসবোটের তথ্য মিলবে। এখানকার হাউসবোটগুলোতে দুদিনের প্যাকেজে ঘুরতে প্রতিজনে চার থেকে ১২ হাজার টাকা লাগে। হাউসবোটের মান বা কেমন সেবা নেবেন, সে অনুযায়ী খরচ নির্ধারণ হয়। এই প্যাকেজের মধ্যেই দুদিনের খাবার-দাবার ও দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণের সুযোগ আছে। সুনামগঞ্জ শহরে এসে শহরের লঞ্চঘাট, সাহেববাড়ী, মল্লিকপুর, ওয়েজখালী, লালপুর, আনোয়ারপুর, ফাজিলপুর ও তাহিরপুর থানা ঘাট থেকে উঠতে পারবেন। প্যাকেজ ছাড়াও অনেকেই আবার পুরো বোট বা নৌকা ভাড়া নেন। আবার কেউ কেউ এক দিনের জন্যও ভাড়া করেন।
হাউসবোট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরাফাত রহমান বলেন, শিশু-কিশোরদের হাওরে জলকেলির ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নিরাপত্তার বিষয়টিতে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন হাউসবোট মালিকরা।
অন্য দর্শনীয় স্থান
হাওরের পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জেলাজুড়ে রয়েছে আরও বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। শহরের লক্ষণশ্রী এলাকায় মরমি সাধক হাসন রাজা, জগন্নাথপুরের বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, দিরাইয়ের উজানধলে বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের বাড়ি ও সমাধি মন্দির দেখতেও অনেক আসেন এই জেলায়।
বছরের বেশির ভাগ সময় হাওর থাকে জলমগ্ন। থইথই জলের ওপর তখন ছোট ছোট গ্রামগুলো ভাসে দ্বীপের মতো।
প্রত্নতাত্ত্বিক দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার গৌরারং জমিদারবাড়ি, দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া জমিদারবাড়ি, ধর্মপাশা উপজেলায় সুখাইড় জমিদারবাড়ি, তাহিরপুর উপজেলায় হলহলিয়া রাজবাড়ি ও দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া জমিদারবাড়ি।
- বিষয় :
- ভ্রমণ
- পর্যটন কেন্দ্র
- সুনামগঞ্জ
- টাঙ্গুয়ার হাওর
