ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি

রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাতছানি
×

.

সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৪ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৮:২১

পাহাড়, অরণ্য, হ্রদের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর সৌন্দর্যের আধার রাঙামাটি। আর ক’দিন পরে নামবে শীত। শীত মৌসুমের এ আগমনীতে উঁচু-নিচু পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, সবুজ অরণ্য, হ্রদের নীল জলরাশিসহ রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রানী হাতছানি দিচ্ছে ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের।  

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরবর্তী পশ্চিমে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য, উত্তরে পার্বত্য খাগড়াছড়ি এবং দক্ষিণে পার্বত্য বান্দরবান জেলার অবস্থানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর রাঙামাটি। কর্ণফূলী নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে কাপ্তাইয়ে নির্মিত হয় ২৫৬ বর্গমাইল এলাকা বিস্তৃত কৃত্রিম  জলাধার (কাপ্তাই হ্রদ)।  কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টি হওয়ার কারণে রাঙামাটিতে গড়ে ওঠে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। রাঙামাটিতে রয়েছে এলোমেলো সারিতে সাজানো উঁচু-নিচু ছোটবড় অসংখ্য পাহাড়ের সমাবেশ। চোখ মেলে তাকালেই আকাশছোঁয়া পাহাড়। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে চোখ জুড়ানো আঁকাবাঁকা কাপ্তাই হ্রদ। সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে অসংখ্য পাহাড়ি ঝর্ণাধারা। অবিরাম হাতছানি দেয় কাপ্তাই  হ্রদের স্বচ্ছ পানি আর বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড়। নৈসর্গিক লীলাভূমি পাহাড়ি জনপদ রাঙামাটি যেন শিল্পীর আঁকা জীবন্ত ছবি।

দর্শনীয় স্থান
রাঙামাটিতে দর্শনীয় স্থানগুলো হলো– পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, চাকমা রাজার রাজবাড়ি, রাজ বন বিহার, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের জাদুঘর, জেলা প্রশাসনে বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধি সৌধ, শুভলং ঝর্ণা ইত্যাদি। বিনোদন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে শুভলং ঝর্ণা, রাঙাদ্বীপ ফুরমোন পাহাড়, নীলাঞ্জনা রিসোর্ট, রাঙা ক্যাফে, মায়াবী দ্বীপ, পলওয়েল পার্ক ও আরণ্যক, বড়গাঙ, আসামবস্তি সড়কের নান্দনিক প্রাকৃতিক দৃশ্য ছাড়াও রয়েছে জুম কিং রিসোর্ট, বার্গি লেক ভ্যালি, রাইন্যাটুগুন ইকো রিসোর্ট ইত্যাদি পর্যটনকেন্দ্র। কাপ্তাই উপজেলায় নিসর্গ রিভার ভ্যালি অ্যান্ড পড হাউস, পেনোরোমা জুম রেস্তোরাঁ, প্রশান্তি পার্ক, পিকনিট স্পট লেকশোর। বাঘাইছড়ি উপজেলায় সাজেক রুইলুই পর্যটনকেন্দ্র। বিলাইছড়ি উপজেলায় নীলাদ্রি রিসোর্ট, পাহাড়ের সবচেয়ে বড় ঝর্ণা ধুপপানি ঝর্ণা, মুপ্পোছড়া ঝর্ণা, হরিণছড়া ঝর্ণা, ন’কাবা ঝর্ণা।  

যেভাবে যাবেন
পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু, রাজবাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট জাদুঘর, জেলা প্রশাসন বাংলো, রাজ বন বিহারে ইচ্ছে করলে আপনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে ঘুরতে পারেন। কারণ এগুলো একেবারেই শহরের ভেতর অবস্থিত। এ দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রাজ বন বিহার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি তীর্থস্থান। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের বেশ কিছু নিদর্শনও রয়েছে। তবে পর্যটকদের নির্ধারণ করা সময়ের মধ্যে ঘুরে আসতে হবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট জাদুঘরে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের কৃষ্টি, সংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শন। রাঙামাটির পর্যটন স্পটের মধ্যে আছে পর্যটন কমপ্লেক্সে ঝুলন্ত সেতু। দুই পাহাড়ের মাঝখানে সংযোগ ঘটিয়ে কাপ্তাই হ্রদের ওপর ঝুলে রয়েছে এ সেতু। তবে এ ঝুলন্ত সেতু দেখতে হলে আপনাকে পর্যটন করপোরেশনকে মাথাপিছু ৩০ টাকা  প্রবেশ ফি দিতে  হবে। এ ছাড়া সুভলং ঝর্ণা বা সুভলংয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যে, নানিয়ারচরের বুড়িঘাট এলাকায় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের স্মৃতি সৌধ, সাংফাং রেস্টুরেন্টসহ অন্য পর্যটন স্পটগুলো দেখতে হলে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করতে হবে। এসব স্থানে যেতে যেতে উপভোগ করা যাবে কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ নীল জলরাশির সৌন্দর্য। তবে এসব স্থান পরিদর্শনের সময় সারাদিনের জন্য নৌকা ভাড়া করলে একসঙ্গে রাজবাড়ি, বন বিহার, পর্যটনের ঝুলন্ত সেতু ও জেলা প্রশাসকের বাংলোও দেখা যাবে। সুভলংয়ের ঝর্ণার কাছাকাছি পৌঁছতে দেখতে পাবেন দুই দিকে সুউচ্চ পাহাড়। এর পর দেখতে পাবেন পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা কয়েকটি ঝর্ণা। এখানে আছে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানি পাথুরে মাটিতে আছড়ে পড়ার অপূর্ব দৃশ্য। 

শুভলং ঝর্ণা, রাঙামাটি। ছবি - জোবায়ের হোসেন

বোট ভাড়া 
ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা বোট ভাড়া রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি বাজারের বোট ঘাটে, রির্জাভ বাজার, বনরূপায় মিলবে। এ ছাড়া পর্যটনের ঝুলন্ত সেতুর পাশের নৌঘাট থেকে বোট ভাড়া পাওয়া যাবে। 

হাউসবোটে নৌ ভ্রমণ
কাপ্তাই হ্রদে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত অসংখ্য হাউসবোট রয়েছে। হ্রদের জলে ভাসমান এসব হাউসবোটে থাকা, খাওয়া ও ভেসে বেড়ানোর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। ইচ্ছে করলে  হাউসবোটে রাত যাপনও করতে পারেন। এ ছাড়া বেরান্ন্যা ইকো রিসোর্টে একক ও ডাবল সিটের কায়াকিং করার ব্যবস্থা রয়েছে।  

কেনাকাটা
তবলছড়ি, বনরূপা, স্টেডিয়াম এলাকাসহ কয়েকটি স্থান থেকে আদিবাসীদের তৈরি কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনা যাবে।

কোথায় উঠবেন
হ্রদের ধারে রয়েছে রাঙামাটি সরকারি পর্যটন মোটেল। এখানে রয়েছে এসি ও নন-এসি রুম। এ ছাড়া হোটেল সুফিয়া গ্রিন ক্যাসল, হোটেল প্রিন্সসহ অসংখ্য হোটেল-মোটেল রয়েছে। যদি দল বেঁধে বন্ধুবান্ধব নিয়ে বা পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকতে চান কটেজের সুব্যবস্থা রয়েছে।

খাওয়া-দাওয়া 
সরকারি পর্যটনের মোটেলে রয়েছে রেস্টুরেন্ট ও বার। তাছাড়া শহরের স্টেডিয়াম এলাকায় আদিবাসী খাবার মিলবে ককরবক, ফুড লাভার, গ্যালারি রেস্টুরেন্ট, ওলোনছাল রেস্টুরেন্ট ছাড়াও বনরূপা এলাকায় ক্যাফে লিংকসহ অসংখ্য রেস্টুরেন্টে। অন্যদিকে রাঙামাটির আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কের পাশে কাপ্তাই হ্রদের ধারে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট। সেখানেও মনোরম পরিবেশে আদিবাসীদের খাওয়-দাওয়া সেরে নিতে পারেন।  

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটিতে এসি ও নন-এসি চেয়ারকোচ সার্ভিস চালু রয়েছে। এর মধ্যে এস আলম, ইউনিক, শ্যামলী, ডলফিন, রিল্যাক্স ও এভারগ্রিন, বিআরটিসি, ইউনিক গ্রিনলাইন ও সেন্টমার্টিন পরিবহন বাস সার্ভিস উল্লেখযোগ্য। তবে ঢাকা থেকে বিমানে বা ট্রেনে  করে গেলে চট্টগ্রামে অবশ্যই নামতে হবে। চট্টগ্রামে পৌঁছে অক্সিজেন বাসস্ট্যান্ড  থেকে প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর পাহাড়িকা চেয়ারকোচের সার্ভিস পাওয়া যাবে। ঢাকা থেকে রাঙামাটি পৌঁছতে সময় লাগবে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। আর চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটিতে পৌঁছতে লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। 

আরও পড়ুন

×