ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

তবুও বড়দিন আসে

তবুও বড়দিন আসে
×

বিধান রিবেরু

বিধান রিবেরু

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০ | আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

নগর পুড়লে আগুনের লেলিহান শিখা দেবালয় এড়ায় না বলেই গত কয়েক মাসের ভেতর আমরা দেখলাম তেজগাঁও জপমালা গির্জা ও কাকরাইলের সাধ্বী মারিয়ার গির্জায় ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটল। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরে খ্রিষ্টান মিশনারি দ্বারা পরিচালিত সেন্ট জোসেফ হাই স্কুলের ভেতরেও বোমা ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমরা জানি, বাংলাদেশে নির্বাচনের মৌসুম শুরু হলে নানা ধরনের সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শুরু হয়। অনেকেই অন্যের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে, সেই আগুন থেকে আলুপোড়া খাওয়ার বন্দোবস্ত করে। গত দেড় বছরে এই নয়া বন্দোবস্তের ভেতরে মানুষ যখন মব বা দঙ্গলতন্ত্র, পুড়িয়ে মারা, দিনদুপুরে ছিনতাই, খুন ইত্যাদি ঘটনায় জর্জরিত ও মর্মাহত; মানুষের মন যখন বড্ড ছোট হয়ে এসেছে শঙ্কা ও ভয়ে, তখন বড়দিনের মতো ধর্মীয় উৎসব হয় তো কিছুটা স্বস্তি দেয়। কিন্তু সেই স্বস্তি মনকে মিথ্যা সান্ত্বনা দেওয়ার শামিল। এই স্বস্তির ভেতর আসলে মিশে আছে অনিরাপদ ও অনিশ্চয়তাবোধ। তারপরও মানুষ বিশ্বাস করে, একদিন সত্যিকার অর্থেই সেই বড়মাপের দিনটি আসবে, যে দিনটি গণমানুষের গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখবে। 

স্বভাবতই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, দেশে তাহলে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা কী? সাধারণ মানুষের কাছে গণতন্ত্র বলতে মূলত ভোটাধিকার। শাসক নির্বাচনের অধিকার প্রয়োগ করা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু মানুষ কেবল রুটি খেয়ে বাঁচে না। বাইবেলে মথি কথিত সুসমাচারে বর্ণিত– ৪০ দিনের উপবাসকালে শয়তান এসে যিশু খ্রিষ্টকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। বলে সামনে থাকা পাথরগুলোকে রুটিতে পরিণত করতে। তখন প্রভু যিশু শয়তানকে প্রত্যুত্তরে বলেন, মানুষ কেবল রুটি খেয়ে বাঁচে না, সে ঈশ্বরের বাক্যেও জীবন পায়। অর্থাৎ যিশু বলতে চাইছেন আধ্যাত্মিক খাদ্যের কথা। গণতন্ত্রেও তাই– মানুষ শুধু ভোট দিয়ে নিজের মনকে পরিতৃপ্ত রাখতে পারে না। এর পাশাপাশি তার চাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। তার চাই সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। এই চাওয়াগুলো আজকের নয়, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের আকাঙ্ক্ষা। ডিসেম্বরে আমাদের এই বিজয়ের মাসেই যিশু খ্রিষ্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন, নিজের রক্তের আখরে মানুষকে পাপমুক্ত করবেন বলে। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ যেন ঈশ্বরের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে। গণতন্ত্রও তাই। মানুষের মুক্তি। এই মুক্তির মাধ্যমে মানুষ পাপমুক্ত হবে। কথা হলো, বাইবেলে বর্ণিত মানবজাতির পাপের যে ধারণা, আর বাস্তব দুনিয়ার যে পাপ-সংক্রান্ত ভাবনা, তা কি ভিন্ন? উত্তর সবারই জানা। 

পাপ যখন আছে দুনিয়ায়, সেখানে পাপ স্বীকার বা দোষ স্বীকারের বিষয়ও আছে। পাপ স্বীকার মানে আপনি সত্যকে কেবল ঊর্ধ্বে তুলে ধরছেন না, বরং সত্যের সঙ্গে আপনি নিজের বোঝাপড়া ঝালাই করে নিচ্ছেন এবং এই নতুন সম্পর্কের নিরিখে আপনি সমাজের অন্যান্য ব্যক্তি ও ক্ষেত্রের সঙ্গেও সম্পর্কের নবায়ন করছেন। দুনিয়ার সব সমাজেই পাপের ধারণা আসলে কমবেশি একই। সবচেয়ে বড় পাপ হলো মানুষ হত্যা। সে হোক অন্যকে বা নিজেকে। সবচেয়ে বড় পাপটিই আমাদের দেশে সংঘটিত হচ্ছে অহরহ। আমরা দেখছি নির্বাচনের আগে একাধিক প্রার্থীকে গুলি ও হত্যা করা হচ্ছে; ব্যবসায়ীকে গাড়িতে তুলে নিয়ে খুন করা হচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের নামে মধ্যযুগীয় কায়দায় অপরের জান কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তো সবচেয়ে যে বড় পাপ, মানুষ হত্যা, সেটার এতটাই ছড়াছড়ি সমাজে, অন্য মাঝারি ও ছোট পাপের কথা আর কী বলব!

এখন গণতন্ত্রে মানুষ যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বা বাকস্বাধীনতা চায় কিংবা মানবিক মর্যাদা চায়, সেখানে সত্যের স্থান কিন্তু সর্বত্র। এটা অনেকটা অম্লজানের মতো। আপনি যাই করেন না কেন, নিঃশ্বাসের ভেতর দিয়ে যদি অক্সিজেন না পান তাহলে আপনি মৃত। কাজেই যে গণতন্ত্রচর্চা সত্য বিবর্জিত, সেই গণতন্ত্র চর্চা আসলে মৃত। নিথর গণতন্ত্রের লাশ বহন করে আপনি বা আমরা কতদূর নিয়ে যাব? একদিকে সমাজে পাপ আমরা নির্মূল করতে পারছি না। সমাজে যে দুর্নীতি ও অন্যায় বিরাজমান, তাকেই ধর্মীয় অভিধায় বলা হয় পাপ। সমাজ তো পাপ ও পাপীতে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। অথচ দেখুন আমাদের উপাসনালয়ের শেষ নেই। সেখানে সারাক্ষণ মানুষকে পাপকার্য থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মানুষ কি তাতে কর্ণপাত করছে?

মুখে মুখে কেবল দুর্নীতিকে জাদুঘরে পাঠানোর কথা বললে লোকজন দুর্নীতি ছেড়ে সাধু-সন্ন্যাসী হয়ে যাবে– এটা ভাবা ভুল। এ জন্য প্রয়োজন হলে রক্ত দিয়ে ভাবতে হবে। অনেকটা যিশু খ্রিষ্টের মতো। তিনি যেমন মানুষকে পাপমুক্ত করার জন্য নিজে ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি হাজার কষ্ট স্বীকার করে, শত বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে এক দল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে, যারা আমাদের সমাজকে এক নতুন বন্দরের দিকে নিয়ে যাবে; আমাদের প্রকৃত নেতা হয়ে উঠবে। যে নয়া নেতৃত্বের জোরে বাংলাদেশ ব্যক্তির সঙ্গে সত্তার, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের এবং সমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক নতুন বোঝাপড়া হাজির করবে। কাজটির জন্য সবচেয়ে জরুরি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বিস্তৃত করা। তবেই আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বড়দিনের দেখা পাব। প্রকৃত মুক্তিই মানুষের জন্য বড়দিন।

দুই হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া যিশু খ্রিষ্টের ব্যাপারে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, তিনি ছিলেন ত্রাণকর্তা, মুক্তিদাতা। এর অর্থ এটাই দাঁড়ায়, তাঁর জন্মের আগেও মানুষ আসলে মুক্তির জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছিল। বর্তমানের বাংলাদেশেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। আমরাও অধীর হয়ে চেয়ে আছি, কবে আসবে সেই মুক্তিদাতা, যে গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ স্তরে, সাম্যবাদের বন্দরে আমাদের পৌঁছে দেবে। সেই দিনটিই হবে আমাদের জন্য প্রকৃত বড়দিন; মর্যাদার দিক থেকে, অর্জনের দিক থেকে।

বিধান রিবেরু: প্রাবন্ধিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক

আরও পড়ুন

×